ওদের হাতেই বিজয়ের পতাকা ওদের চোখেই আমাদের স্বপ্ন

    সোমা-শাহানাকে বিজয়ের অভিনন্দন

    দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে স্বপ্ন সত্যি হলো। এ স্বপ্ন শুধু নিউইয়র্কপ্রবাসী বাঙালিদেরই ছিল না, ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সকল প্রবাসী বাঙালির। একই সঙ্গে এ স্বপ্ন বাংলাদেশের মানুষও দেখত। স্বপ্ন দেখাটাই স্বাভাবিক ছিল। স্বপ্ন বাস্তবায়ন না হওয়াটাই ছিল চরম বিস্ময়! নিউইয়র্ক বিশ্বের রাজধানীই কেবল নয়, অভিবাসীদের জন্য স্বর্গরাজ্যও বলা হয়। এর মধ্যে আবার সিটির দুই বরোÑকুইন্স ও ব্রুকলিনের কোনো কোনো অঞ্চল ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামেও খ্যাত।

    অথচ নিদারুণ এক হতাশা বয়ে বেড়াতে হচ্ছিল নিউইয়র্কের বাংলাদেশিদের। সর্বাধিক বাঙালির বসবাস নিউইয়র্কে, বিশেষ করে কুইন্স ও ব্রুকলিনে। নানা উপলক্ষে নানা আয়োজন। মূলধারার ছোট-বড় সব স্তরের নেতাদের আনাগোনা। তাদের নির্বাচিত করার ব্যাপারে আমাদের বাঙালি কমিউনিটির গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সর্বস্তরের স্বীকৃতি। অথচ নিজেদের কোনো প্রতিনিধি নেই। না সিটি হলে, না আলবেনিতে কিংবা ক্যাপিটল হিলে। ছোট ছোট অনেক স্টেটে রয়েছে নির্বাচিত বাঙালি প্রতিনিধি, কিন্তু নিউইয়র্কে নেই। যেখানে গিজগিজ করছে বাঙালি। একটি কথা ইংরেজিতে না বলেও কাজকর্ম, জীবনযাপনে কোনো সমস্যা হয় না অনেকেরই। দিব্যি তারা চালিয়ে নেয় নিজেদের।

    এত কিছু সত্ত্বেও নিউইয়র্কের বাঙালি কমিউনিটি এত দিন না পাওয়ার হতাশায় ভুগছিল। সেই হতাশার চাদর হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে আমাদের না পাওয়ার ঝুলি ভরিয়ে দিলেন সোমা সাঈদ ও শাহানা হানিফ। এত দিনে আমাদের অধরা স্বপ্ন ধরা দিল। গত ২ নভেম্বরের নির্বাচনে সোমা সাঈদ কুইন্স কাউন্টির জাজ পদে এবং শাহানা হানিফ সিটি কাউন্সিল নির্বাচনে ডিস্ট্রিক্ট-৩৯ থেকে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়ে রেকর্ড সৃষ্টি করে যে নয়া ইতিহাস রচনা করলেন, প্রবাসজীবনে আমাদের জন্য এগিয়ে চলার সাহস জুগিয়ে যাবে অনন্তকাল। আবারো অভিনন্দন সোমা সাঈদ ও শাহানা হানিফ আপনাদের।

    ডেমোক্র্যাট সংখ্যাগরিষ্ঠ স্টেট নিউইয়র্কে ২২ জুনের প্রাইমারিতে ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থীদের মধ্যে নির্বাচন করে বিজয়ী হওয়ার পর থেকে তাদের চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়াটা ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। সেই আনুষ্ঠানিকতাই সম্পন্ন হলো ২ নভেম্বরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। সোমা-শাহানার এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশিরা সাফল্য লাভের এক নতুন পথ খুঁজে পেল। সেই সঙ্গে প্রমাণিত হলো সেই বহুল প্রাচীন প্রবাদ : ‘একবার না পারিলে দেখো শতবার’! এ এক অভাবনীয় সাফল্য। এক অনির্বচনীয় আনন্দ সংবাদ। এই আনন্দে কেবল নিউইয়র্কে বসবাসরত বাঙালিরাই অহংকার বোধ করছে না। বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব প্রান্তের সব বাঙালির জন্যই সোমা-শাহানার বিজয় এক দারুণ অহংকার! সোমা-শাহানাকে নিয়ে সব বাঙালিই আজ গর্বিত। তারা দুজনই তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে লক্ষণীয় ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে আমাদের সবার মুখোজ্জ্বল করেছেন।

    এ কথা আমরা সবাই জানি, অনেক দিন থেকেই বাঙালি কমিউনিটির অনেক চেনাজানা মানুষ, যারা নেতা হিসেবেও কমিউনিটিতে খ্যাত এবং পরিচিত, বিপদে-আপদে তাদের কমিউনিটির পাশেও পাওয়া যায়, এমন অনেকেই সিটি হলে আমাদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য চেষ্টা করে আসছিলেন। কোথায় ঘাটতি, কোথায় সীমাবদ্ধতা, কোথায় সমস্যাÑকেউই যেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। কিন্তু শিকে ছিঁড়ছিল না। অথচ এই নির্বাচন ব্যতীত আর সব ক্ষেত্রেই প্রবাসজীবনে বাঙালিদের সাফল্য-কৃতিত্ব ঈর্ষণীয়। ব্যবসা-বাণিজ্যে বাঙালিরা এখন অগ্রসরমাণ। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার পুঁজির পাশাপাশি এখন বিলিয়নিয়ার বাঙালি ব্যবসায়ীর নামও শোনা যায়। বাঙালি বিশেষজ্ঞ শিক্ষক, চিকিৎসক, গবেষক, বিজ্ঞানীর নামও এখন মূলধারায় প্রশংসার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। মূলধারার মিডিয়া, মানি মার্কেটেও অনেক বাঙালি সাফল্য বয়ে আনছেন।

    স্কুল-কলেজ-ভার্সিটিতে আমাদের সন্তানদের ক্রমবর্ধমান সাফল্য এখন যুক্তরাষ্ট্রের সীমানাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। স্পেশালাইজড হাইস্কুল, হার্ভার্ড, ইয়েল-কলম্বিয়াসহ আইভি লিগের সব ইউনিভার্সিটিতে এখন বাঙালি ছাত্রছাত্রীর তালিকা বৃদ্ধি পেয়েই চলেছে। একই সঙ্গে আমাদের বাঙালি শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা এই প্রবাসের প্রতিকূল পরিবেশেও আশাব্যঞ্জক।

    বাঙালি কমিউনিটিকে এ দেশে নবীন কমিউনিটি হিসেবে এখনো গণ্য করা হয়। এই নবীন কমিউনিটি হয়েও নানা স্তরে আমাদের সাফল্য ও অগ্রযাত্রা অসামান্য। কিন্তু এই একটি ক্ষেত্রে, অর্থাৎ এদেশের মূলস্রোতে আমরা কিছুতেই সাঁতার কাটতে পারছিলাম না। বারবার চেষ্টা করেও কেন যেন সাঁতারে কূল পাচ্ছিল না। আমরা যখন থেকে বৃহত্তর সংখ্যায় এ দেশের নাগরিক হয়ে ভোটার হতে শুরু করলাম, তখন থেকেই এ দেশের সব শাখা-প্রশাখায় আমাদের ওড়াউড়ি শুরু হয়। শুরু হয় স্বপ্ন দেখা এবং দিনযাপনের সঙ্গে সঙ্গে সে স্বপ্ন বড় হতে থাকে। কিন্তু স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। সেই স্বপ্ন অবশেষে ধরা দিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে। এতকাল কেন যেন স্বপ্ন সফল হওয়ার জন্য আমাদের অন্তর্গত প্রার্থনা কিছুতেই বাস্তব রূপ নিতে পারছিল না।

    অবশেষে সেই স্বপ্ন ধরা দিল নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি সোমা সাঈদ ও শাহানা হানিফের হাতে। ২২ জুনের স্বপ্নের বীজ চারা হয়ে মাটি ফুঁড়ে মাথা তুলল। এবার আমাদের কণ্ঠে ঝংকৃত হচ্ছে, ‘আমাদের যাত্রা হলো শুরু।’ আমরা আর পেছনে ফিরে তাকাব না। সাগর যতই ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ হোক, পাহাড় যতই উঁচু আর চড়াই-উতরাই হোক, আর পেছনে ফিরে তাকানো নয়। নতুনের হাতে কেতন উড়িয়ে আমাদের ছুটে চলার যে সূচনা, সে যাত্রা যেন আর না থামে।

    কথায় বলে : ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে।’ এত দিন আমাদের যারা মূলস্রোতের প্রতিনিধি হতে চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন আপ্রাণ, তাদের উদ্যোগে, প্রয়াসে, শ্রমে-মেধার খামতি না থাকলেও কিছু মৌলিক বিষয়ে সীমাবদ্ধতার কথা অস্বীকার করা যাবে না বলে অভিজ্ঞজনদের অভিমত। মূলধারায় নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি গুণাবলির শীর্ষ দুটি হচ্ছে ভাষা এবং মূলধারার সংস্কৃতি। এ দুটি গুণ এ দেশের মানুষের মতোই রপ্ত করে নিতে না পারলে এ দেশের যেকোনো রেসে পেছনেই পড়ে থাকতে হবে। আমাদের শ্রমের ফসল অন্যে ভোগ করবে। এর পরই গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়, তা হলো নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া ও সমঝোতা এবং ঐক্য। নিজেদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতা বন্ধ করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াইয়ে নামা, যা আমাদের পক্ষে অসম্ভব বলেই মনে করেন অনেকে। আর আমাদের সমর্থনে অন্য কমিউনিটির গুরুত্বপূর্ণ এবং নেতৃস্থানীয় মানুষদের সংগঠিত করা।

    এ দুর্বলতা এবং সীমাবদ্ধতা সোমা সাঈদ ও শাহানা হানিফের ছিল না বললেই চলে। তাদের প্রতি সমর্থনও ছিল এ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের। এ দেশে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ, এ দেশের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ওঠা-বসা, বন্ধুত্ব, এ দেশের মূলধারায় কর্মজীবনÑতাদের অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যেকোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। অভিজ্ঞজনদের ধারণা, সোমা ও শাহানার এ বিজয় তারই ফসল। তারা দুজন ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রাইমারিতে যখন ভালো ব্যবধানে উতরে গেলেন, ডেমোক্র্যাট স্টেট নিউইয়র্কে তখনই তাদের চূড়ান্ত বিজয় নির্ধারিত হয়ে যায়। দ্বিধা-সংশয় যা ছিল, সবই চূড়ান্ত নির্বাচনের ফল ঘোষণার প্রতীক্ষার জন্য।

    অ্যাটর্নি সোমা সাঈদ এবং শাহানা হানিফ দুজনই চূড়ান্ত ফলাফলে ভালো ব্যবধানেই তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পরাজিত করেছেন। প্রবাসী বাঙালি কমিউনিটিকে মূলধারার নির্বাচনে প্রথম জয়ের স্বাদ এনে দিয়েছেন। বাঙালিদের আনন্দিত ও গর্বিত করেছেন দেশে ও প্রবাসে। সোমা সাঈদ ও শাহানা হানিফের বিজয়ের এই পথ ধরে এবার আমাদের কেবলই সামনে এগিয়ে চলা। আমাদের ব্যর্থতার হতাশা বয়ে বেড়ানোর দিন শেষ। আর পেছনে ফিরে চাওয়া নয়। সোমা-শাহানা বিজয়ের যে চিহ্নরেখা এঁকে দিলেন, তাদের উত্তর-প্রজন্ম এই চিহ্ন ধরে এগিয়ে যাবে সদর্পে। তাদের প্রজন্মও অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত হয়ে এগিয়ে আসবে তাদের পিতা-মাতা ও পূর্বগামীদের গর্বিত করতে। আমরা আর পেছনে চাইব না। এত দিন যা পারিনি, এখন থেকে সেই হতাশা ঝেড়ে ফেলে বিজয়ের পথে হাঁটতে শিখে গেলাম। আমাদের বিজয়ের পতাকা এখন নতুনদের হাতে।

    আমাদের প্রার্থনা, সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে তারা ভোটারদের আস্থা অর্জন করে নিজেদের আসন স্থায়ী করবেন। পিতা-মাতার দেশ বাংলাদেশের হয়ে তারা তাদের সর্বাত্মক ভূমিকা রাখবেন। ওদের হাতে আমাদের যেমন পতাকা, আমাদের স্বপ্নও ওদের চোখে। ওদের কাছেই আমাদের সব চাওয়া-পাওয়া।

    সোমা সাঈদ ও শাহানা হানিফকে ঠিকানা এবং তার অগণিত লেখক-পাঠক, শুভানুধ্যায়ীদের পক্ষ থেকে অশেষ শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।