খাঁটি দলরে ছাতার তলায় ভুয়া সংগঠন

    শুরু হলো বাঙালি জীবনের শোকের মাস আগস্ট। বাঙালিদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ, তিন সেরা বাঙালিকে আমরা হারিয়েছি এই আগস্ট মাসেই। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মহাপ্রয়াণ দিবস ১৫ আগস্টও ১৯৭৫। কতিপয় বিশ্বাসঘাতক, মির জাফরের দল একজোট হয়ে লেলিয়ে দেওয়া বর্বর ঘাতকদের হাতে নৃশংসভাবে নিহত হন বিশ্বের সকল নিপীড়িত মুক্তিকামী মানুষের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার আগে ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আবার বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও মৃত্যুবরণ করেন ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট। এই তিন মহামনীষীকে হারিয়ে বাঙালি যতটা নিঃস্ব হয়েছে, বাঙালিসহ ততোধিক নিঃস্ব হয়েছে বিশ্বের সব নিপীড়িত-মুক্তিকামী মানুষ। এই শোকের মাসে প্রথম সম্পাদকীয় লেখা শুরুর পূর্বে ঠিকানা তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছে।
    মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন একনাগাড়ে ক্ষমতায় আছে প্রায় ১৩ বছর। যতই গণতান্ত্রিক দল হোক, যতই গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে সরকার পরিচালনা করুক, দীর্ঘদিন একনাগাড়ে ক্ষমতায় থাকার কিছু কুফল দেখা দেয় বলেই ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। দলে এবং নেতৃত্বে কিছু কিছু দুর্বলতাও চোখে পড়ে। অনেকেই মনে করেন, আওয়ামী লীগও সেই দুর্বলতায় আক্রান্ত হচ্ছে ইতিহাসের পথ ধরে। দেশের সব মানুষ যখন একটি দলে ভিড়ে যায়, তখন দলে এ রকম দুর্বলতা দেখা দেবেই। স্রোতের সঙ্গে যেমন কিছু কচুরিপানাও চলে আসে ভাসতে ভাসতে, তেমনি দল যখন প্রতিপক্ষহীনভাবে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকে, তখন আবর্জনার মতো কিছু লোকও দলে ঢুকে পড়ে ভালো দলকেও দূষিত করে তোলে। আওয়ামী লীগের এখনকার অবস্থাও তথৈবচ। পাপিয়া, সাহেদ, হেলেনা, সাবরিনাদের মতো অনেক ধড়িবাজ, দুর্নীতিবাজ, চাটুকার, তোষামোদকারী, মতলববাজ, পচা-গলা, দুর্গন্ধময় অনেক লোক দলে ঢুকে পড়েছে। দলের নাট-বল্টুও অনেক ঢিলে হয়ে পড়েছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষেও আর তখন দলের সব দিকে নজর দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। আওয়ামী লীগের এখন মনে হয় সেই দশা হয়েছে। আওয়ামী লীগের ‘লীগ’, ‘বঙ্গবন্ধু’, মুক্তিযুদ্ধের নামে বাংলাদেশে এখন শত শত ভুঁইফোড় সংগঠন! সেই সব সংগঠনে সব ভুঁইফোড় নেতা। যাদেরকে দলের ভেতর থেকেই বলা হচ্ছে, এসব হাইব্রিড নেতার ভিড়ে দলের প্রবীণ-নবীন পরীক্ষিত নেতাদের এখন দুরবিন দিয়ে দেখলেও খুঁজে পাওয়া ভার।
    বঙ্গবন্ধু মুজিবকে যারা প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছেন, দলের জন্য যারা ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ, যারা এখনো দলের তৃণমূলের আসল শক্তি, তাদের এখন দলের নেতৃত্বে কোনো জায়গা নেই। খাঁটি দলপ্রেমিক অনেকেরই মুখে আফসোস, বুকের দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়। তাদের অবস্থা এখন ‘না পারেন সইতে, না পারেন কইতে’। আওয়ামী লীগের ছাতার তলায় এখন ভুঁইফোড় সংগঠনের ছড়াছড়ি। কারো তেমন কোনো মাথাব্যথা আছে এ নিয়ে, তা মনে হয় না। মাঝেমধ্যে দু-একটা কথা উচ্চারিত হতে শোনা যায়। কদাচিৎ দু-একজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও দেখা যায়। যেমন অতিসম্প্রতি ভুঁইফোড় একটি সংগঠন গড়ে তোলার দোষে মহিলা আওয়ামী লীগের উপকমিটির সদস্য হেলেনা জাহাঙ্গীরকে প্রথমে বহিষ্কার এবং পরে র‌্যাব তাকে গ্রেফতার করেছে। এতে পরিস্থিতি খুব হেরফের হবে কিংবা দলে সৃষ্ট আবর্জনা এবং দূষিত রক্ত দূর হয়ে যাবেÑএমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। আওয়ামী লীগ এখন আত্মতুষ্টিতে এতটাই মগ্ন যে তারা এখন কোনো শুভাকাক্সক্ষীর কথাও শুনতে চায় না।
    আওয়ামী লীগে কী রকম আবর্জনা এবং দূষিত রক্ত জমেছে, কিছুটা অনুভব করতে পারা যাবে ঠিকানার গত ২৮ জুলাই সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত একটি খবর থেকে। খবরটির শিরোনাম : ‘লীগ ও বঙ্গবন্ধুর নামে দেশে আট শতাধিক ভুঁইফোড় সংগঠন’। শিরোনাম থেকেই বুঝতে পারা যায়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে কী ভয়ংকর অবস্থা! কেননা আট শ ভুঁইফোড় সংগঠনের মধ্যে নিশ্চয় আওয়ামী লীগের নির্দিষ্ট কয়েকটি অঙ্গসংগঠন ছাড়া আর সবই ভুঁইফোড়। এবং সব ভুঁইফোড় সংগঠনের ভুঁইফোড় নেতাদেরও কোনো জবাবদিহি নেই। জবাবদিহি নেই বলে এসব সংগঠনের নেতাকর্মীদের দলের শৃঙ্খলা, গঠনতন্ত্রের বাধ্যবাধকতা মেনে চলারও কোনো বালাই নেই। অথচ এরা দুর্নীতি, অনিয়ম, লুটপাট, চুরিচামারি, দুর্বল-অসহায়দের মুখের গ্রাস যতই কেড়ে খাক, তার সব দায় গিয়ে পড়ে সরকারের ওপর। আল্টিমেটলি জবাবদিহি করতে এবং খেসারত দিতে হয় সরকারকেই।
    এবার একটু নজর ফেরানো যাক প্রকাশিত খবরটির দিকে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে টানা তৃতীয় মেয়াদের রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। ক্ষমতার দীর্ঘ সময়ে আওয়ামী লীগের ‘লীগ’ শব্দ ও বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য কিংবা ‘মুক্তিযোদ্ধা’ নাম ব্যবহার করে দেশে আট শতাধিক ভুঁইফোড় সংগঠন গড়ে উঠেছে। এদের অধিকাংশ সংগঠনের নিজস্ব কার্যালয় নেই। নেই নিজস্ব কার্যক্রম। দলের প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় নেতা, এমপি-মন্ত্রীদের পৃষ্ঠপোষকতা ও ছত্রচ্ছায়ায় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, তদবির-বাণিজ্য, কমিটি বাণিজ্য ও ক্ষমতার সিন্ডিকেট তৈরি ও অপব্যবহার করছে তারা। অনুমোদনহীন এসব রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা নানা সময়ে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত হলেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি আওয়ামী লীগ। এ নিয়ে বারবার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে ক্ষমতাসীন দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের। সাম্প্রতিক সময়ে ‘বাংলাদেশ চাকরিজীবী লীগ’ নামে অনুমোদনহীন একটি নতুন রাজনৈতিক সংগঠনের আত্মপ্রকাশ হওয়ায় ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। দলের কেন্দ্রীয় অনুমোদন না থাকায় সংগঠনটির কথিত ‘সভাপতি’ হেলেনা জাহাঙ্গীরকে আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক উপকমিটি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’
    খবরটি থেকে আরো জানা যায়, নামসর্বস্ব এসব সংগঠনের নামের সঙ্গে ‘লীগ’ শব্দ ব্যবহার ছাড়াও ‘বঙ্গবন্ধু’, ‘বঙ্গমাতা’, ‘শেখ রাসেল’ এবং বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নাম লাগানো হচ্ছে। হেলেনা জাহাঙ্গীরের মতো অনেকেই এই প্রক্রিয়ায় বিপুল অর্থবিত্তের মালিক বনে গেছেন। মাঝেমধ্যে এ রকম দু-একজনকে বহিষ্কার-গ্রেফতার করে হইচই ফেলে দেওয়া হলেও আইনি ব্যবস্থায় দৃশ্যত তাদের কোনো দণ্ড হয়েছেÑজনগণের এমন জানা নেই। অথচ দিন শেষে এসব কাজের দায় দল এবং দলের নেতৃত্বকেই বইতে হয়। অতীতেও এ রকম পরিস্থিতির জন্য দলকে এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে।
    কেননা স্রোতের শেওলার মতো এসব ভুঁইফোড় নেতারা দলে ঢুকে সব অপকর্ম সম্পন্ন করে দলের চরম সর্বনাশ ঘটিয়ে সটকে পড়ে। বিপদে তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই এদের কেবল বহিষ্কার আর গ্রেফতার করাই যথেষ্ট নয়। এ রকম খবরে মানুষও সন্তুষ্ট নয়। তারা এসব কালপ্রিটদের উপযুক্ত শাস্তি দেখতে চায়। কারণ এরা দলের সম্পদ নয় একেবারেই। এরা দলের বোঝা। এই বোঝা জাতির ঘাড় থেকে নামাতে হবে। তাতেই দেশ, দশ ও দলের মঙ্গল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ভালোবাসার দল আওয়ামী লীগকে দুর্নীতির দুর্নাম থেকে মুক্ত রাখতে না পারলে ভবিষ্যৎ কখনোই এ জন্য দায়ীদের ক্ষমা করবে না।