গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এবং দেশের রাজনীতিতে বিদেশের হস্তক্ষেপ

    দুনিয়াটাকে যেভাবেই ভাগ করা যাক, সব সময় দুভাগে বিভক্ত-ধনী-নির্ধন। মালিক-শ্রমিক। শোষক-শোষিত। গণতন্ত্র-স্বৈরতন্ত্র। আর বর্তমানে করোনা আক্রান্ত নিও-নরম্যাল সময়ে ভার্চুয়াল এবং অ্যাকচুয়াল। নির্ধন-শ্রমিক-শোষিতকে এক কাতারে দাঁড় করানো যায়। গণতন্ত্র দুই পক্ষেই দাঁড়ায়। গণতন্ত্র কীভাবে চর্চিত হচ্ছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তার প্রয়োগ হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে। গণতন্ত্র অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুপাক্ষিকতার ওপর ভিত্তি করে সরকার পরিচালনার সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য একটি ব্যবস্থা। সর্বাধিক আলোচিত একটি তত্ত্বও।

    গণতন্ত্রের দোষ-গুণ নির্ভর করে মানুষের যেমন সংজ্ঞা ‘ম্যান ইজ এ র‌্যাশনাল অ্যানিম্যাল’-তার ওপর। মানুষের মধ্যে র‌্যাশনালিটি যখন অধিক ক্রিয়াশীল দেখা যায়, তাকে একজন ‘উত্তম মানুষ’ বলে গণ্য করা হয়। অ্যানিম্যালিটি অধিক প্রভাব বিস্তার করতে দেখা গেলে তাকে আমরা ‘অধম মানুষ’ বলে বিবেচনা করি। ঠিক তেমনি গণতন্ত্রও। গণতন্ত্রের চরিত্র নির্ভর করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতদের চরিত্রের ওপর। যেমন তারা রাষ্ট্রে কীভাবে গণতন্ত্রের ব্যবহার করছেন এবং কীভাবে জনগণের ওপর তা প্রয়োগ করছেন। বাস্তবে প্রমাণ না রেখে শুধু মুখে দাবি করলেই কেউ গণতন্ত্রী হয়ে যায় না। অথবা গণতন্ত্রের নামে গণতান্ত্রিক পথে নির্বাচিত হলেই কোনো সরকার গণতান্ত্রিক হয় না। বাস্তবে প্রয়োগ ও দৃশ্যমানভাবে গণতান্ত্রিক কোনো সরকারের মধ্যে গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যগুলো দেখা গেলেই কেবল একটি কর্তৃপক্ষ গণতান্ত্রিক বলে দাবি করতে পারে। বর্তমান সময়ে যারা নিজেদের গণতান্ত্রিক এবং যেসব সরকার নিজেদের গণতান্ত্রিক সরকার বলে দাবি করে, তাদের অনেকের মধ্যেই গণতন্ত্রের চরিত্র-বৈশিষ্ট্য থাকে না।

    গণতন্ত্রের মর্মবাণী বিশ্বাস, চর্চা এবং প্রয়োগে। এ শুধু রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই নয়, পরিবার এবং সমাজের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। বিশ্বাস কী রকম তার উদাহরণ আমরা প্রায় সবাই জানি। উদাহরণটা এ রকম : ‘আমি আপনার আদর্শে বিশ্বাস না করলেও আপনার আদর্শ নিয়ে আপনার চলার জন্য আমি কখনই বাধা হয়ে দাঁড়াব না।’ অর্থাৎ একজনের বিশ্বাসকে রক্ত দিয়ে হলেও শ্রদ্ধা জানাতে হবে। এটাই গণতন্ত্রের মর্মকথা। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। বিশ্বে গণতান্ত্রিক দেশ বলে যারা নিজেদের দাবি করে, সেসব দেশের দিকে নজর দিলে অনেক দেশেই দেখা যাবে কীভাবে গণতন্ত্রের সেই সৌন্দর্য বিনষ্ট হচ্ছে। সেসব দেশে গায়ের জোরের ভাষাকেই গণতন্ত্রের ভাষা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। গুন্ডামি যে গণতন্ত্রের ভাষা নয়, এটা তাদের বোধে আসে না। পরমতসহিষ্ণুতা দারুণভাবে উপেক্ষিত। শোভনতা, সংযম, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অনুপস্থিত। কারো প্রতি অশ্রদ্ধা দেখাতে পারলেই আমরা অনেকে নিজেদের গণতন্ত্রী ভাবি। গণতন্ত্রের অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশিষ্ট্য বিদায় দিয়ে এক দলের শাসনকে চাপিয়ে দিয়ে দেশ শাসনের চেষ্টা চালানো হয়, যা গণতন্ত্রের সঙ্গে একেবারেই যায় না।

    এ রকম একটি পরিবেশ যে দেশে সৃষ্টি হয়, সে দেশে বিদেশিদের নাক গলানোর সুযোগ যেমন তৈরি হয়, সেই সুযোগের সদ্ব্যবহারের প্রবণতাও বিদেশিদের মধ্যে লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে, নির্বাচনের আগ আগ দিয়ে বিদেশিদের তৎপরতা অদৃশ্য থেকে অধিক দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ‘ঠিকানা’য় প্রকাশিত একটি সংবাদের প্রসঙ্গেই এসব কথা বলার তাগিদ থেকেই অনুভব করা। ঠিকানায় সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছিল গত ২২ সেপ্টেম্বর সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠায়। শিরোনাম ছিল : ‘আবারও তৃতীয় ধারার পেছনে সুশীল সমাজ/ বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ফের তৎপর বিদেশি কূটনীতিকেরা’।

    প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের পরবর্তী নির্বাচন এবং নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে ফের তৎপর বিদেশি কূটনীতিকেরা। পাশাপাশি দেশে আবারও তৃতীয় ধারার চেষ্টা চালাচ্ছে সুশীল সমাজ। যেকোনো দেশের নির্বাচনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে সহযোগিতা করার রেওয়াজ রয়েছে। বিষয়টিতে সহযোগিতার কথা বলা হচ্ছে। সহযোগিতা পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু ‘সহযোগিতা’ আর ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ’ যে এক নয়, তা নিশ্চয় বুঝতে কারো খুব অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এই হস্তক্ষেপের দৃষ্টান্ত অন্তত বাংলাদেশের মানুষের সামনে রয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পূর্বে বাংলাদেশে অবস্থানরত কূটনীতিকদের হস্তক্ষেপ দেখা গেছে, যা একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কূটনীতিকদের হস্তক্ষেপ ব্যতীত আর কিছু হতে পারে না। সে সময় একশ্রেণির কূটনীতিকের অশোভন ও অগণতান্ত্রিক আচরণ লক্ষ করা গেছে।

    এ ক্ষেত্রে অনেকেই বলে থাকেন, বিদেশিদের হস্তক্ষেপ অনেক সময় ‘আমন্ত্রণ’ জানিয়ে আনা হয়। এ কথা অবশ্যই অস্বীকার করা যাবে না। আমরা নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করতে ভালোবাসি, যা অত্যন্ত লজ্জার এবং অনাকাক্সিক্ষত। যেহেতু আমরা অনেকেই রাজনীতি করি দেশের সেবা করার জন্য নয়, কেবলই নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য; তাই দেশ গোল্লায় যাক, ‘আমার সোনার হরিণ চাই’। তবে সব সময় ‘দাওয়াত’ দিয়ে বিদেশিদের আনা হয়, তেমনটাও নয়। কথায় বলে, ‘গরিবের সুন্দরী বউ সকলেরই ভাবি।’ তেমনি দুর্বলের ওপর সবলের লাঠি ঘোরানো। বাংলাদেশে আবার ‘সুশীল সমাজ’ বলে একটি গোষ্ঠী আছে, যারা যেকোনো বিষয়ে সালিস মানেন বিদেশিদের কাছে। দেশের মানুষের বিচার মানেন না। বলা-লেখায় তারা জনগণের কথা বলে বলে অস্থির হয়ে ওঠেন, জনগণ যখন কোনো বিষয়ে রায় দেন, তখন তাদের রায়কে ‘অশিক্ষিত মানুষের রায়’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন। রায় নিজেদের পছন্দমতো হয় না বলে। অর্থাৎ ‘বিচার মানি তালগাছটা আমার’! বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এ রকম এক পরিস্থিতির মধ্যেই আছে। তাদের সামনে বিকল্প আর কোনো পথ খোলা নেই। সামনে তাকালে বাঘ, পেছনে ফিরলে ডাকাত।

    আমাদের জন্য লজ্জা এবং অনাকাক্সিক্ষত হলেও অনেকে বলে থাকেন, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ এবং নীতিনির্ধারকেরা হয় গণতন্ত্রের অর্থ বোঝেন না, অথবা বুঝতে চান না। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদেরা ক্ষমতায় থাকলে এক কথা বলেন, ক্ষমতা থেকে সরে গেলে ঠিক তার বিপরীত কথা! যারা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সৈনিক বলে বুক ফোলান, তারাই বঙ্গবন্ধুকে নিজ নিজ স্বার্থে ব্যবহার করেন। আমরা ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সেই ভাষণের কথাও ভুলে গেছি। তিনি সেই ভাষণে পার্লামেন্টের অধিবেশন বসা নিয়ে বলেছিলেন, ‘কেউ যদি ন্যায় কথা বলেন, তিনি যদি একজনও হন, তার কথা মেনে নেব।’ এমনকি তিনি সাংবাদিকদের প্রতি যে ব্যবহর করতেন, সেটাও আমরা ভুলে যাই। আজকাল সে কথা কে মানে! একজন কেন, সহস্র জনও ন্যায় বললে বলপ্রয়োগে তাদের মুখ বন্ধ করে দিতে দেখি। মানুষের মুখ বন্ধে পায়ে বেড়ি পরানোর জন্য নতুন নতুন সব আইন করা হয়।

    প্রকৃত ক্রিমিনালদের জন্য ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের সব মরিচা ধরা আইন ব্যবহার করা হয়। তাও সঠিক প্রয়োগ হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। সবচেয়ে বড় অভিযোগ গণতান্ত্রিক দেশে জনসাধারণকে শায়েস্তা করা হয় পুলিশ-র‌্যাব দিয়ে। এর দায় কার? আমরা ১৯৭১-এ রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনেছি। ১৯৯০-এ আবার রক্ত দিয়ে গণতন্ত্র আনা হলেও বাংলাদেশে স্বাধীনতার সুফল এবং গণতন্ত্রের সুফল যেভাবে ভোগ করার কথা ছিল, দুটো থেকেই মানুষ বঞ্চিত হয়েছে। এর কারণ হলো গণতন্ত্রের কথা সবাই আমরা মুখে বলি, কিন্তু গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত করার দায়িত্ব আমরা কেউই নিতে পারিনি। যেখানে মননে-মস্তিষ্কে, চিন্তায়-ভাবনায় স্থান পেলে গণতন্ত্র বিকশিত হয়, সেখানে জায়গা পায়নি গণতন্ত্র। মুখের কথায় বন্দি হয়ে আছে আমাদের প্রত্যাশিত গণতন্ত্র। আরো হতাশার কথা, আমরা আমেরিকার মতো দেশে বসবাস করেও গণতন্ত্রের চর্চা করতে পারি না। বাংলাদেশ থেকেই যেন চারা উপড়ে আনা হয়েছে! আমরা স্থান-কাল-পাত্র বুঝতে চাই না। গায়ের জোর দেখিয়ে নেতা-নেত্রীকে শ্রদ্ধা জানাতে চাই, যা কোনোভাবেই হওয়া সম্ভব হয় না। এতে কোনো নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয় না। নেত্রীও খুশি হতে পারেন না। গণতন্ত্রের চর্চাও হয় না। কেবল একটি নির্বাচনের মধ্যেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় না।

    গণতন্ত্রের চর্চা করতে হয় প্রাত্যহিকতায়। বিশ্বাসে স্থান দিতে হয়। গণতন্ত্রের সব বৈশিষ্ট্য মেনে, সব সৌন্দর্য পরিচর্যা করে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে।