গন্ডলা, ভেনিস ও আমার দেখা ইউরোপ

    ভ্রমণ

    লাবলু কাজী :

    নিউইয়র্কের জেএফকে থেকে ট্যাপের সুবিশাল ডিসি টেন বিমান চার চাকার মাটি ঘর্ষণ শেষে ধোঁয়া ছেড়ে থামিয়ে দিল মিলানের মেলপেনসিনা বিমানবন্দরে। ইউরোপ ঘোরার প্রথম স্টপ।

    ইউরোপে এলাম। এর আগে চার-পাঁচবার আমায় ঘুরিয়েছে পাঁচতারা হোটেলের মালিকেরা ট্রেনিংয়ের জন্য। ভিয়েনা, আমস্টারডাম, প্যারিস, জার্মানি আমার আগেই দেখা হয়েছে। আইফেল টাওয়ার, জার্মানির রাইন রিভারের তীরে অনেক সকাল-সন্ধ্যা কেটেছে দেশ ছাড়ার শোকতাপে। মায়ের কথা বড্ড মনে পড়ত, অনেক কাঁদতাম। চোখযুগলের অশ্রুতে মিশে মায়ের কাছে ইছামতীর কোলে এসে মায়ের পা সিক্ত করত কি না, কে জানে? নদীর পানি অনেক গড়িয়েছে, বয়স বেড়েছে, কালো-চুল সাদায় নতুন মুকুলের মতো শোভা পাচ্ছে। আমায় আবার এবার নিজের খরচে ইতালি আর পর্তুগাল নিয়ে ছাড়ল। বড় কৌতূহল ছিল এই ইতালি দেখার, অবশেষে সাধও পুড়িল, মনও ভরল।

    দেশে গেলে সবার মুখে মুখে ইতালির রবধপ। ভালো ঘরের মেয়েদের ইতালি প্রবাসী বিধায় বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন অভিভাবকেরা। কারণ ছেলে কাঁড়ি কাঁড়ি ইউরো রোজগার করে। ছেলে খবরের কাগজ বিক্রি করে, না ফুলের মালা রাস্তায় বিক্রি করে, কিছু যায় আসে না। ৩০-৪০ লাখ টাকা খরচ করে রোমানিয়ার বর্ডার ক্রস করে ইতালি এসে শীতের রাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রাত পাড়ি দেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। অনেক বাঙালি ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এদের সাহায্য কেন করেন না। উত্তর : এক-দুই ওয়াক্ত খাওয়ানো যায়, থাকার জায়গা দিতে কেউ রাজি হয় না। অপরিচিত চোর-বদমাশও তো হতে পারে, সব নিয়ে রাতে ভাগলে কে সামলাবে। কাজেই ফুটপাতেই থাকতে হয়। যত দিন রিফিউজি স্ট্যাটাস না মেলে।

    ফ্লোরেন্সে অনেক দিন পর হিরোর সাথে দেখা। আমাদের গ্রামের লাল মিয়া দাদার ছেলে। ওর বাসায় আমি তিন রাত ছিলাম, খুব ভালো লেগেছে। ও এবং ওর বউ আমায় এত যত্ন করেছে যে সারা জীবন তা ভুলব না। আমার কখনো মনে হয়নি আমি ঘরছাড়া ভিন দেশে। রক্তের আত্মীয় ছাড়াও ওরা আমায় আত্মার আত্মীয়তার বন্ধনে জড়িয়ে ফেলেছে। ওদেরকে বড় মিস করছি নিউইয়র্কে ফিরে। লাইচ কাকার মেয়ে কানিজ এবং ওর স্বামী আমায় অনেক অনুরোধ করেছিল প্যারিসে যাওয়ার জন্য। টিকিট রেডি ছিল, কিন্তু আমার আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। এর আগে তিনবার প্যারিসে গিয়েছি, আইফেল টাওয়ার দেখা অনেকবার। তাই করোনার মধ্যে যাওয়ার আর সাহস হয়নি। লাইচ কাকা অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন, তার মেয়ের অন্তরটাও অত্যন্ত ভালোমানুষিতে ভরপুর।

    ভেনিস দেখার শখ সেই যৌবনকাল থেকেই। নামটার মধ্যে আমি কেমন যেন রোমাঞ্চের গন্ধ পেতাম। ধনীদের আড্ডাখানা এই শহরটিও শেষ পর্যন্ত দেখা হলো, আলহামদুলিল্লাহ। গন্ডলায় চড়ে ঘোরা, যা কিনা আমাদের দেশের রংচং মাখানো কোষা নৌকার মতো, চড়ে মজা আর মজা। আধা ঘণ্টা চড়ার খরচ ৮০ ইউরো। মাঝি নিজেকে যে কী পারদর্শী ভাবে, না চড়লে জানা যাবে না। খুব যত্ন নেয় এই গন্ডলার এবং ঝকঝকা রাখে তেল দিয়ে পালিশ করে। এখানকার প্রধান যানবাহন নৌকা ও স্পিডবোট। সেন্ট মার্ক গির্জা এখানকার মেইন আকর্ষণ, মানুষ আর মানুষে ভরা।

    মিলান ইতালির ফ্যাশন নগরী। নতুন নতুন ফ্যাশন এখানেই শুরু হয়। ডুমো, লাস্ট সাফার অব লিওনার্দো ডি ভেঞ্চির এখানেই দেখার সৌভাগ্য হয়। মিলান সেন্ট্রাল ট্রেন স্টেশন দেখলে মন ভরে যায়। মিলানে পৃথিবীর সব দেশের লোকের সমাগম। মিলান ইউনিভার্সিটিতে মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বিদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। কফি অ্যাসপ্রেসো, কপাচিনো, ইতালিয়ান পিৎজা-পাস্তা, টিরামিশো, জিলাটো এখনো আমার মুখে যেন লেগে রয়েছে।

    আসার পথে পর্তুগাল দেখার পালা, এক রাত থাকতে হলো। মাঝারি ধরনের দেশ এটি। লোকজন খুবই ভদ্র ও সভ্য। ওয়াইন, সি-বিচ বড়ই প্রসিদ্ধ। এদের এয়ারলাইন্স এয়ার পর্তুগাল বা ট্যাপে আমার নিউইয়র্কে ফিরে আসা। জীবনে আমি অনেক দেশ ভ্রমণ করেছিÑস্মৃতিগুলো মেঘলা হাওয়ার মতো আমায় সিক্ত করে। কুয়াশায় ঢাকা থাকলেও সব ঝাপসা ঝাপসা সোনালি রোদের স্বপ্ন দেখায়, পুরোনো বেরিয়ে আসে স্বপ্ন দেখায় নতুনে বাঁচার। আর হয়তো ফিরে যাওয়া হবে না। তবুও ইছামতীর তীরের সেই ছোট্ট গাঁয়ের ছোট্ট ছেলেটির এই ছোট ছোট পাওয়া কম কিসের…

    -লেখক : কবি, কলামিস্ট। নিউইয়র্ক