গভর্নর ক্যুমোর পদত্যাগ : বিদায় নিলেন রাজসিক সংবর্ধনায় সিক্ত হয়ে

    দাবা খেলার কথা আমরা সবাই জানি। কোন ভুলে যে কখন কার রাজা মাত হবে, খেলা শেষ হওয়ার একমুহূর্ত আগেও বলা যায় না। সব মানুষই ভাবে, আমার কোনো ভুল হয় না বা হবে না। ক্ষমতার মদমত্ততায় অথবা অধিকতর আত্মবিশ্বাসে অনেকে বাস্তব ভুলে কল্পনার জগতে ঢুকে পড়ে। তারা আর ভাবতে পারে না একদিন তাদের ক্ষমতা ছাড়তে হবে অথবা যেকোনো মুহূর্তে ক্ষমতাচ্যুতির আশঙ্কা থাকে। ভুলে যায় ক্ষমতার এক পিঠে থাকে ভালোবাসা, অন্য পিঠে থাকে ঘৃণা বা অসম্মান। প্রবাদ বলে : ‘তোমাকে বধিবে যে গোকূলে বাড়িছে সে।’ রাজপাট, রাজ্য শাসন, রাজনৈতিক ক্ষমতাচ্যুতির আরেকটা দিকও আছে। সে হচ্ছে ষড়যন্ত্রের দিক, বিশ্বাসঘাতকতার দিক। রাজনীতিতে শত্রু এবং বন্ধু চেনা কঠিন। কে যে উমি চাঁদ, কে যে জগৎ শেঠ আর মিরজাফর-মোশতাক আর কে যে সৈয়দ নজরুল, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর, চিনতে অনেক সময়ই ভুল হয়ে যায়। এই ভুলের ভেতর দিয়ে তৈরি হয় কালো মেঘ। ঝড় ওঠে কালবৈশাখীর। উড়িয়ে নেয়, তছনছ করে দেয় সবকিছু। হরণ করে ক্ষমতা, জীবন। রাজনীতির খেলা বোঝা কঠিন। কেউ জনতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, কেউ নিজে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হন।

    নিউইয়র্কের সদ্য বিদায়ী গভর্নর অ্যান্ড্রু ক্যুমো জুনিয়র কোনটার শিকার হয়েছেন, তা ভবিষ্যত একদিন বলবে! যদিও তিনি দুর্নামের বোঝা মাথায় নিয়ে বিদায় হয়েছেন। ক্যুমোর সেই কলঙ্কের জন্য নিউইয়র্কবাসী কী ভাবে? নিউইয়র্কের মানুষ কি সত্যি সত্যি মনে করে, যে অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে ক্যুমো পদত্যাগ করলেন, সে অভিযোগ সত্য? নাকি আরোপিত অভিযোগ? কত অভিযোগ যে পরবর্তী সময়ে মিথ্যা হয়েছে, কত সত্য যে সর্বাংশ হয়েছে, ইতিহাসের তার ভূরি ভূরি প্রমাণ মেলে। ইতিহাস হয়তো একদিন ক্যুমোর ঘটনা নতুন কথা বলবে। মিথ্যা হবে আজকের অভিযোগ। মিথ্যা হয়ে যাবে আজকের সত্য। মহাকালের কষ্টিপাথরে কোন সত্য সামনে এসে দাঁড়ায়, আজকের পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে কে বলতে পারে? সেই মহাকালের সত্য জানার জন্য ক্যুমো থাকবেন না। আমরাও থাকব না। এমনকি যাদের চক্রান্তে কিংবা ষড়যন্ত্রে বা প্রতিহিংসার শিকার হয়ে ক্যুমো ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলেন, সেদিন তারাও থাকবে না। মিথ্যা অভিযোগ তোলার দায়ে তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সুযোগও থাকবে না। তবু প্রকৃত সত্য বের হয়ে আসবে।

    গভর্নর অ্যান্ড্রু ক্যুমো গত ২৪ আগস্ট পদত্যাগ করেছেন যৌন হয়রানি এবং সঙ্গে আরও কিছু অভিযোগ মাথায় নিয়ে। তার আগে তিনি সব অভিযোগই অস্বীকার করে আসছিলেন। অবশেষে, অ্যাটর্নি জেনারেলের তদন্তেও দোষী সাব্যস্ত হলে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন অ্যান্ড্রু ক্যুমোকে পদত্যাগের আহ্বান জানান। তিনি ১৭ আগস্ট পদত্যাগের ঘোষণঅ দেন এবং তা কার্যকর হয় গত ২৪ আগস্ট মঙ্গলবার। তিনি পদত্যাগ করে বলেছিলেন, ‘আমার পক্ষ থেকে সাহায্য করার এখন সবচেয়ে ভালো উপায় হলো পদত্যাগ করা এবং সরকারকে শাসনকাজ পরিচালনা করতে দেওয়া।’ তবে তিনি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পর্কে এ কথাও বলেন, ‘আমি একজন যোদ্ধা। আমি লড়াই চালিয়ে যাব, কারণ আমি বিশ্বাস করি, এই বিতর্ক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমি মনে করি, এটা অন্যায় এবং অসত্য।’

    পদত্যাগের ১৪ দিন বাকি থাকলেও অ্যান্ড্রু ক্যুমো কদিন আগেই পদত্যাগ করেন। তিনবারের নির্বাচিত গভর্নর ক্যুমো, নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমসের তদন্তে অন্তত ১১ জন নারীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তিনি পদত্যাগ করলেন। এর বাইরে নার্সিং হোম বাসিন্দাদের কোভিড-১৯-এ মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে এবং তার বইয়ের প্রকাশনার চুক্তিতে সরকারি অর্থ ব্যবহার নিয়েও অভিযোগ উঠেছে ক্যুমোর বিরুদ্ধে। এ ছাড়া কোভিড-১৯ পরীক্ষায় তার ঘনিষ্ঠজনদের অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগও তদন্ত হবে।

    আমেরিকার মতো দেশেও জনপ্রতিনিধিদের ফাঁসিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে যৌন অভিযোগ খুবই ধারালো অস্ত্র। নারী-পুরুষের যে আচরণ একসময় কিছুই মনে হয় না, সেটাই অন্য এক সময়ে অভিযোগের তীর হয়ে বুকে বিঁধে। এমনকি তিন-চার যুগ আগের ঘটনাও অভিযোগ হিসেবে দাঁড়িয়ে যেতে পারে। প্রমাণিত হলে দণ্ডও ভোগ করতে হয়। জনপ্রতিনিধিদের নিম্নতর পদ থেকে সর্বশীর্ষ পদের প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত এই যৌন হয়রানির অভিযোগে বিপর্যস্ত হন। তার সর্বশেষ উদাহরণ প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। তারা দুজনই অভিসংশন হওয়ার হাত থেকে বেঁচে গেলেও নাজেহাল এবং সমালোচনার হাত থেকে রক্ষা পাননি।

    আসলে নেতাকে মানুষের মন জয় করতে হয় দীর্ঘ অধ্যবসায়ের মাধ্যমে। দীর্ঘদিন ধরে ভালো কাজ করে। মানুষকে ভালোবেসে মানবিকতা ও মনুষ্যত্বের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা, মানুষ ও দেশের প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বস্ততার পরীক্ষায় পাস করে একজন জনপ্রিয় নেতা হয়ে উঠতে হয়। কিন্তু যেকোনো একটি ঘটনাতেই সে জনপ্রিয়তায় ধস নেমে যেতে পারে। জনপ্রিয়তার শীর্ষস্থান থেকে শূন্যের কোঠায় অবনতি ঘটতে পারে। ঘটনাটি ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত, সজ্ঞানে বা জ্ঞানের বাইরে ঘটতে পারে। কিন্তু পরিণতি ভোগ করতে হয় যার বেলায় ঘটে, তাকে। মানুষের ভালোবাসা এবং মন জয় করার জন্য যারা কাজ করেন, তাদের মনে রাখতে হবে, জনপ্রিয়তা হচ্ছে কচুপাতার পানি, অনেক সময় বিনা বাতাসেই পতন ঘটে। মুহূর্তেই হিরো থেকে জিরো হয়ে যেতে পারেন। সম্মান, শ্রদ্ধা ও মর্যাদার আসনটি হারিয়ে ভিলেন হতে পারেন। সেই কালজয়ী গানের মতো ‘সকালবেলা রাজা রে ভাই, ফকির সন্ধ্যাবেলা’।

    নিউইয়র্ক স্টেটের গভর্নর অ্যান্ড্রু ক্যুমো এই কদিন আগেই প্রবল জনপ্রিয় এবং নন্দিত একজন গভর্নর ছিলেন। কোভিড-১৯ অতিমারিকালে ছিলেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রশংসিত। রাজনৈতিক অভিজ্ঞ মহলের অনেকেই মনে করছিলেন, অ্যান্ড্রু ক্যুমো আমেরিকার রাজনীতিতে শীর্ষ পর্যায়ে যাবেন। সে পরম্পররাও তার ছিল। তিনি ইতিপূর্বে ফেডারেল সরকারের মন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন। তার পিতাও ছিলেন নিউইয়র্কের অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন গভর্নর। সে কারণে তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ, সেসব অভিযোগের পেছনে কোনো চক্রান্তও থাকতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। আগামী দিনে অ্যান্ড্রু ক্যুমোর যে সম্ভাবনা, সেই সম্ভাবনাকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করে দিতেই হয়তো এসব অভিযোগ-কে জানে!

    এখন দেখা যাক নিউইয়র্কবাসী কী ভাবছেন অ্যান্ড্রু ক্যুমোর এভাবে বিদায় নেওয়া প্রসঙ্গে। এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়, নিউইয়র্কের মানুষের ক্যুমো সম্পর্কে ধারণা মোটেও একটা নেগেটিভ নয়, তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও। আজকের অনেক কিছুই থাকে ভবিষ্যতের গর্ভে। ক্যুমোর আজকের জন্য তিনি কতটা দায়ী আর কতটা সত্যি সত্যি চক্রান্তের শিকার, সেদিন মানুষ ঠিক জানবে। আজকের মানুষ, এমনকি অ্যান্ড্রু ক্যুমোও থাকবেন না। কিন্তু সত্য ঠিকই উদ্ভাসিত হবে সূর্যের আলোয়। নিউইয়র্কবাসীর সঙ্গে সঙ্গে তিনি যাদের সঙ্গে নিয়ে প্রশাসন চালাতেন, তারাও ক্যুমো সম্পর্কে খুব বিরূপ ধারণা নিয়েছেন বলে মনে হয় না। কারণ তাকে তার সহকর্মীরা যে রাজসিক বিদায় সংবর্ধনা দিয়েছেন, তাতে মনে হয় না তাদের মনে কোন সংশয় ছিল।

    ভবিষ্যত কী রায় দেয়, আমরা অবশ্যই সেই দিনের প্রতীক্ষায় থাকব। দেখব সেদিন সত্য কার পক্ষে দাঁড়ায়-অভিযোগের পক্ষে নাকি অ্যান্ড্রু ক্যুমোর পক্ষে। নিউইয়র্কবাসীর আজকের ধারণার পক্ষে নাকি বিপক্ষে।