দেশজুড়ে রেড অ্যালার্ট জারি

    বিশেষ প্রতিনিধি : তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ইস্যুতে বর্তমানে দেশের রাজনীতি উত্তপ্ত। রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ ক্রমেই উপরে উঠছে। এ পরিস্থিতিতে হঠাৎ করেই সরকার রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে রেড অ্যালার্ট জারি করেছে। সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত ২৩ নভেম্বর মধ্যরাত থেকে এ রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়। মহানগরে ডিসি এবং জেলায় এসপিরা এই লিখিত আদেশ জারি করেছেন।
    এরপরই পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব ইউনিটে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া শুরু হয়। এমনকি পুলিশের দায়িত্বশীল যেসব কর্মকর্তা ছুটিতে ছিলেন, তাও বাতিল করা হয়েছে। তাদের দ্রুত নিজ নিজ কর্মস্থলে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
    একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, চিকিৎসার জন্য বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর দাবিকে ঘিরে কেউ যেন অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে, সে লক্ষ্যে দেশব্যাপী নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য সংকট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও গুজব বা অসত্য তথ্য ছড়ানোর কারণে বিশৃঙ্খলার বিষয়টিতেও নজর রাখা হচ্ছে। দেশের সব থানাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্থাপনা ঘিরে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারিও।
    বিএনপির দাবি, খালেদা জিয়া এখনো ক্রিটিক্যাল অবস্থায় রয়েছেন। তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। যেকোনো সময় ঘটতে পারে অঘটন। এ অবস্থায় তাকে মুক্তি দিয়ে বিদেশে তার চিকিৎসার দাবি জানাচ্ছে দলটি। অন্যদিকে বিএনপির এই দাবির পেছনে গভীর দুরভিসন্ধি দেখছে সরকার। চিকিৎসার চেয়ে এখানে নানা রাজনীতি-কূটনীতি মুখ্য বলে নিশ্চিত হয়েছে সরকার। এ-সংক্রান্ত বিষয়ে কয়েকজনের টেলিফোন কথোপকথনের রেকর্ড রয়েছে সরকারের কাছে। প্রয়োজন বা জরুরি মনে করা মাত্র তা গণমাধ্যমকে দিয়ে বাজারে ছাড়ার প্রস্তুতি রয়েছে। এ অবস্থায় খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে তার চিকিৎসার দাবিতে বিএনপির আন্দোলনের হুমকির বিষয়টি মোটেই গুরুত্ব দিচ্ছে না আওয়ামী লীগ। তবে খালেদার চিকিৎসার বিষয়ে পুরোপুরি সতর্ক সরকার। তার চিকিৎসার নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি এ ব্যাপারে সর্বশেষ তথ্য জানার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাও দিচ্ছেন। খালেদা জিয়ার অসুস্থতার বিষয়ে দেশের সাধারণ মানুষও চোখ রাখছেন গণমাধ্যমে। রাজনীতি থেকে কূটনীতিপাড়া-সবারই দৃষ্টি রয়েছে সাবেক সেনাপ্রধানের স্ত্রী তিনবারের প্রধানমন্ত্রীর শারীরিক অবস্থার দিকে। বিদেশি কূটনীতিকেরাও রাখছেন তীক্ষ্ণ নজর। বিশেষ করে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে তুলনামূলক কঠিন ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছেন ইউরোপীয় কূটনীতিকেরা।

    ৭৬ বছর বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বহু বছর ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, ফুসফুস, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন। লিভার ও কিডনি সমস্যা তাকে বেশি ভোগাচ্ছে। সাথে হার্টের সমস্যাও আছে। সম্প্রতি তার রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়ায় চিকিৎসকেরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তার শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি নেই, বরং দিন দিন অবনতি হচ্ছে। গত ২০ নভেম্বর রক্তবমি হওয়ার পর ক্রনিক লিভার রোগে আক্রান্তের আশঙ্কায় লিভার থেকে ফ্লুইড (তরল) নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। তাতে দেখা যায়, তার লিভারের সমস্যা খুবই জটিল। তিনি লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত। এ ধরনের সমস্যায় লিভার অকার্যকরও হতে পারে। তখন লিভার প্রতিস্থাপনও করতে হয় বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, খালেদা জিয়ার রক্তে শর্করা অনেক বেশি। রক্তচাপ ওঠানামা করছে। এ বয়সে এত রোগ-এসব বিবেচনায় দেশে তার উন্নত চিকিৎসা সম্ভব নয়। বাইরে নিলে তাকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব। বর্তমানে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের সিসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি।

    এদিকে দলের চেয়ারপারসনকে নিয়ে উভয় সংকটে পড়েছে বিএনপি। একদিকে তার মুক্তি ও উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর দাবিতে আন্দোলনে নামতে হয়েছে, অন্যদিকে সরকার আইনগত জটিলতা দেখিয়ে এ দাবিতে সাড়া না দিলে আন্দোলন ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলে চিহ্নিত হতে পারে। এমনকি উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যেকোনো অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতারা। অন্যদিকে দেশবাসী ও প্রবাসীরা যখন খালেদার চিকিৎসা ইস্যুতে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনায় মুখর, তখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান এ নিয়ে রহস্যজনকভাবে নীরব! বর্তমানে লন্ডনে বসে দেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বললেও মা খালেদা জিয়াকে নিয়ে দলীয় নেতাকর্মী কিংবা দেশ ও জাতির জন্য নেই তার কোনো বক্তব্য বা ঘোষণা। এ নিয়ে দলের ভেতরে মায়ের ইস্যুতে সন্তানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

    সতর্ক থাকলেও পাত্তা দিচ্ছে না সরকার : খালেদা জিয়ার চিকিৎসাকে কেন্দ্র করে বিএনপির অনশন ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন, সংসদ চত্বরে দলীয় এমপিদের মানববন্ধন থেকে পদত্যাগের হুমকি, শীর্ষস্থানীয় নেতাদের তীব্র আন্দোলনের হুমকি, প্রেসক্লাবে সমাবেশ, ঢাকায় ছাত্রদলের মিছিলে পুলিশি হামলায় অর্ধশত নেতাকর্মী আহত, নাটোরে পুলিশ-সাংবাদিকসহ ২০ জন আহত, বুধবার সারা দেশে স্মারকলিপি কর্মসূচি, বিদেশে নিতে পরিবারের আবেদন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ৫ শরিক দলের সরকারের প্রতিনিধির সাথে দেখা করে খালেদা জিয়ার মুক্তি চাওয়া, চিকিৎসকদের উদ্বেগজনক ভাষ্য-কোনো কিছুকেই পাত্তা দিচ্ছে না সরকার কিংবা ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। কারণ খালেদার চিকিৎসার বিষয়ে পুরোপুরি সতর্ক সরকার ও আওয়ামী লীগ। সরকারের পক্ষ থেকে তার চিকিৎসার নিয়মিত খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। তাই খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে সরকারের দিক থেকে সংশয় নেই। যতটুকু সন্দেহ ছিল, তা কেটে গেছে হাসপাতালের নির্ভরযোগ্য সোর্সে। কিন্তু সন্দেহ দেখা দিয়েছে তার বিদেশে চিকিৎসার জন্য গড়ে তোলা আন্দোলনের তোড়জোড় নিয়ে, যা সরকারকে কিছুটা প্রশ্নের ঘোরেও ফেলেছে। বিএনপির নেতাকর্মীদের আন্দোলনে পেছন থেকে ফুয়েল জোগানো মহলের তৎপরতাও স্পষ্ট সরকারের কাছে। খালেদা জিয়া দেশছাড়া মাত্র বাংলাদেশে নানান অঘটন ঘটতে পারে-এমন তথ্য যাচাই করে সত্যতা পেয়েছে সরকার। এর পেছনে কাজ করছে একটি মহল।

    তারেকের রহস্যময় ভূমিকা : খালেদা জিয়াকে সুচিকিৎসা দিতে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের দাবি, দলীয় নেতাকর্মীদের আর্তনাদ আর দেশব্যাপী শুভাকাক্সক্ষীদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা চরমে হলেও নিজ সন্তান তারেক রহমানের আশ্চর্য রকম নীরবতায় সর্বমহলে বিরাট প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। দেশের বাইরে বসে দেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বললেও মা খালেদা জিয়াকে নিয়ে দলীয় নেতাকর্মী কিংবা দেশ ও জাতির জন্য নেই তার কোনো বক্তব্য বা ঘোষণা। খালেদা জিয়ার ইস্যুতে তারেক রহমানের স্পষ্ট বক্তব্য বা ঘোষণার দাবি উঠেছে দলের একটি অংশ থেকে। দলের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকগুলোতে তারেক রহমানের উদ্ধৃতি দিয়ে শীর্ষস্থানীয় নেতারা কথা বললেও সাধারণ নেতাকর্মীরা চান খালেদা ইস্যুতে তারেকের স্পষ্ট বক্তব্য। কারণ দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর মধ্যে প্রকাশ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেওয়ায় এই দুজনের মাধ্যমে খালেদা জিয়া ইস্যুতে কোনো কর্মসূচি কার্যকর হবে না বলে অনেকেই মনে করছেন। তাই খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়ে তারেক রহমানই সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন বলে নেতাকর্মীদের বিশ্বাস। তবে বিএনপির একটি অংশ মনে করছে, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা গর্ভধারিণী মা খালেদা জিয়াকে নিয়ে তারেক রহমান রাজনীতি করতে চাচ্ছেন। খালেদা জিয়ার অঘটন ঘটলে একে পুঁজি করে সরকারকে চাপে ফেলতে চাচ্ছেন তিনি। এ জন্য পরিবারকে সামনে রেখে রাজনীতির ভূমিকা থেকে দলকে দূরে রাখা হয়েছে।

    ইউরোপীয় কূটনীতিকদের তৎপরতা : একদিকে চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতির দাবি, আরেকদিকে নির্বাচনে বিদেশি পর্যবেক্ষণের পুরোনো দাবির নতুন সংস্কারের ঘটনা সরকারের জন্য উদ্বেগজনক। রাজনীতি এবং নির্বাচন নিয়ে তুলনামূলক কঠিন ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছেন ইউরোপীয় কূটনীতিকেরা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলি কথা বলছেন আগ বাড়িয়ে। নির্বাচনের প্রস্তুতি ও আইনি কাঠামোসহ সরকারের কিছু দুর্বল জায়গায় হাত দিয়েছেন তিনি। চলমান একদলীয় ইউপি নির্বাচনে ভোটের নামে তামাশা, প্রাণহানি, টাকার খেলা, দলীয় প্রার্থীদেরও সহ্য করতে না পারাসহ যৌক্তিক কিছু বিষয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন এরই মধ্যে পর্যবেক্ষণ করে চলছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের রাজনীতির ভেতর-বাইরের ঘটনা সম্পর্কে চার্লস হোয়াইটলি পূর্ণমাত্রায় ওয়াকিবহাল। তিনি দীর্ঘদিন বাংলাদেশে মিশনে রাজনৈতিক শাখায় কাজ করেছেন। এবার এসেছেন ইইউ মিশনের ডেলিগেশন প্রধান ও রাষ্ট্রদূত হয়ে। ব্রিটেনের দক্ষিণ এশিয়া, জাতিসংঘ ও কমনওয়েলথ-বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী লর্ড তারিক আহমেদের প্রতিক্রিয়া আরেকটু ইঙ্গিতপূর্ণ। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে কেবল নির্বাচন নয়, অংশগ্রহণমূলক রাজনীতিও প্রত্যাশা করে ব্রিটেন। ইউরোপীয় শক্তির এমন মতিগতি সরকারের আঁতে ঘা দেওয়ার মতো। পর্যায়ক্রমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বিশ্বের ক্ষমতাধর আরো কয়েকটি দেশের যুক্ত হওয়ার আলামত রয়েছে। দুই বছর আগেভাগেই পাতানো নির্বাচনের বিষয়ে সাবধানবাণী সূচনা করেছে তারা। এর পেছনে বিএনপির সম্পৃক্ততা আঁচ করছে সরকার। তার ওপর লন্ডনে তারেক রহমানের রাজনৈতিক-কূটনৈতিক তৎপরতার বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের ন্যূনতম হস্তক্ষেপ আশা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সে দেশের আইনেও কীভাবে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, এ-সংক্রান্ত কিছু পদক্ষেপের জন্য তৎপরতাও চালানো হয়েছে। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার কানে নেয়নি। উপরন্তু তারেককে নানা সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি প্রমোট করছেন সেখানকার সরকারের কিছু ক্ষমতাবান ব্যক্তি। বিষয়টিকে নিজের জন্য অপমানজনকভাবে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এদিকে ব্রিটেনসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কয়েকটি দেশের সূক্ষ্মচালে সম্প্রতি তারেক রহমানের দেশে ফেরার গুঞ্জন গতিময় করা হচ্ছে। তারেক রহমান স্ত্রী-কন্যাসহ লন্ডন থেকে শিগগিরই ঢাকায় আসবেন- এমন গুঞ্জনের পেছনে কাজ করছে ভিন্ন আরেকটি মহল। নানা কারণে গুঞ্জনটি প্রশ্নবিদ্ধ হলেও এর একটি ইফেক্ট রয়েছে। তার ওপর সরকার আর আগের মতো জাতীয় নির্বাচন করতে পারবে না-লন্ডন থেকে এমন বার্তা দিয়েছেন তারেক রহমান। কোন ভিত্তিতে, কিসের আলোকে তিনি এমন আভাস দিয়েছেন, সেই প্রশ্ন ঊহ্যই থেকে যাচ্ছে।