নির্বাচন উৎসব হয়ে ফিরে আসুক বাংলায়

    ‘শীতের হাওয়ার লাগল নাচন আমলকীর এই ডালে ডালে/ পাতাগুলি শিরশিরিয়ে ঝরিয়ে দিল তালে তালে।’ বাংলাদেশে এখন শীতের হাওয়ায় পাতা ঝরে, তবে আমলকীর ডালে ডালে নাচন লাগে কি না, প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে বলা কঠিন। একসময় আমলকীর ডালে অবশ্যই নাচন লাগত। নইলে বিশ্বকবি এমন কথা লিখতেন না। বাংলার বর্ণময় ষড়ঋতুতে মুগ্ধতা তৃতীয় নয়নধারী কবি-সাহিত্যিক কেবল নন, বাংলার সাধারণ মানুষের মনেও শীত প্রভাব ফেলত। শীতে বাংলার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনে দুর্ভোগের সীমা-পরিসীমা থাকত না। শীতের কামড় থেকে বাংলার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অনেকেই নিজেদের জীবন পর্যন্ত রক্ষা করতে পারতেন না। আবার শীতকে মধুমাসও বলা হতো। খেঁজুরের রস, রসের পিঠা, তেলের পিঠাÑহরেক রকম পিঠার বাহারি সব নাম। সম্পন্ন মানুষদের ঘরে ঘরে পিঠার উৎসব।

    বাংলার শীত সেই রূপ বর্ণ সব হারিয়েছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদী যেমন এমন শীর্ণ, শুষ্ক। শীতও পাতা ঝরার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনে আতঙ্কও ছড়ায়। বাংলাদেশের রাজনীতির কথা শুধু বাংলাদেশের মানুষই শুধু নয়, বিশ্ববাসীও জানে। বাংলাদেশের রাজনীতি উত্তাপ ছড়াতে শুরু করে শীতে। সে উত্তাপে প্রথম প্রথম শীতার্ত মানুষ দেহমনে একটু উষ্ণতা অনুভব করলেও সেই উষ্ণতা দিন যত যেতে থাকে তত সে উত্তাপে আগুন ঝরতে থাকে। সে আগুন রাজপথ পোড়ায়, মানুষ পোড়ায়। সে আগুনে পুড়ে ভস্ম হয় গাড়ি-ঘোড়া, বাস-ট্রাক। পোড়ে মানুষের কপাল, ফসল তোলে রাজনীতিবিদেরা। তাদের হয় পোয়াবারো। নির্বাচন সামনে থাকলে শীত আরো বেশি উত্তাপ নিয়ে হাজির হয়। শীত যত তীব্র হবে, উত্তাপ তত সহিংসতায় রূপ নেবে। শীত যেমন বাংলার সংবাৎসরিক বিষয়, শীতে রাজনীতির শুরু এবং ক্রমান্বয়ে তা সহিংসতায় রূপ নেওয়াটাও অনেকটা, অন্তত নির্বাচনের আগ-আগ দিয়ে, সংবাৎসরিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    শীতে যে রাজনীতি গতি পাচ্ছে, সে খবর পত্রপত্রিকায় চোখ রাখলেই বুঝতে পারা যায়। শুধু ঠিকানাতেই প্রতি সংখ্যায় এ সংশ্লিষ্ট একাধিক সংবাদ দেখা যায়। ঠিকানার ৩ নভেম্বরের একটি সংখ্যা। সেই সংখ্যার এক প্রথম পৃষ্ঠাতেই চারটি খবর আছে রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট। বেশ বুঝতে পারা যায়, সেসব খবরে যেমন রাজনীতি আছে, উত্তাপের আঁচও টের পাওয়া যায়। গত ৩ নভেম্বরের সংখ্যায় এ রকম খবর : ‘ঘরে ঘরে ক্ষমতার লোভ’; ‘সারা দেশে গোপনে প্রার্থী বাছাই করছে বিএনপি’; ‘কে হচ্ছেন নতুন সিইসি : বিচারপতি না আমলা’ এবং ‘মাঠছাড়া বিরোধী দল’।

    ২০২৩-এর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতেই হয়তো নির্বাচনের ঢোল বাজতে শুরু করবে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এখন থেকেই তার মহড়া দিতে শুরু করে দিয়েছে। মহড়া শুরু হয় প্রধান নির্বাচন কমিশনারÑসিইসি নিয়োগ নিয়ে। তা থেকে ধীরে ধীরে ডালপালা গজাতে থাকে। সংবিধানে সিইসি নিয়োগের বিধান স্পষ্ট করে দেওয়া থাকলেও সেই বিধান মেনে নিয়োগ করা হয় না। ক্ষমতাসীন দল নানা কায়দা-কানুন করে নিজেদের পছন্দের লোককেই নিয়োগ দিয়ে থাকে। কেন আইন করা হয় নাÑতা অনুমান করা যায় প্রত্যেক জাতীয় নির্বাচনের পরেই। বিরোধী পক্ষ সিইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আন্দোলন করার চেষ্টা করে। নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে। এসব নিয়ে অনেক সময় জ্বালাও-পোড়াও শুরু হয়ে যায়। প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। সহিংসতার দায়ে মামলা দিয়ে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের হয়রানি করে তাদের জীবন দুঃসহ করে তোলা হয়।

    ‘কে হচ্ছেন নতুন সিইসি’?Ñএ নিয়ে ইতিমধ্যেই জল্পনা-কল্পনা, দরকষাকষি শুরু হয়ে যাওয়ার কথা কানে আসছে। ‘কে হচ্ছেন নতুন সিইসিÑবিচারপতি না আমলা’ খবরটিতে যা বলা হয়েছে, তার সারমর্ম হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ ২০২২-এর ফেব্রুয়ারিতেই নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগ দেবেন। সে উদ্দেশ্যে অচিরেই তিনি একটি সার্চ কমিটি গঠন করবেন। যদিও বিরোধী দল এবং সুশীল সমাজের অনেকেই নতুন আইন প্রণয়ন করে সেই আইনে ইসি নিয়োগের দাবি জানাচ্ছেন। সরকারপক্ষে স্পষ্ট বলা হয়েছে, সার্চ কমিটি গঠন করেই নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে। আইন করে নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবিও ইতিমধ্যে খারিজ হয়ে গিয়েছে। পাশাপাশি এ প্রশ্নও উঠেছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে হবেনÑবিচারপতি, না আমলা!

    ১৯৯৬ সলের পূর্ব পর্যন্ত সাধারণত বিচারপতিদেরই কেউ সিইসি হতেন। ১৯৯৬ সালের ৯ এপ্রিল যে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়, সেই কমিশনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে মো. আবু হেনার যোগদানের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশনে প্রথম আমলার প্রবেশ ঘটে। বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা এবং তার আগের এটিএম শামসুল আলম এবং কাজী রকিবউদ্দিন আহমেদও আমলা। ওয়ান ইলেভেনের সরকার আসার পর থেকে এ পদটি আর আমলাদের হাতছাড়া হয়নি।
    আবার ঠিকানার ১০ নভেম্বর সংখ্যায় একটি সংবাদে স্পষ্ট করেই রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রাণহানি, রক্তপাত, সহিংসতা হচ্ছে। সেই সহিংসতা কোথায় গিয়ে শেষ হবেÑএখনই বলা কঠিন।

    রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘রাজনীতি হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।’ বিশ্লেষকেরা যে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন, তার কারণ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে দেশে বেশ কয়েকটি ইস্যু, যেমন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য, ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধিসহ আরো কিছু ইস্যুতে জন-অসন্তোষ, জন-অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে বিরোধীরা আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে। সেই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। এবং নির্বাচনকে সামনে রেখে জ্বালাও-পোড়াও, প্রাণহানির পর্যায়ে চলে যেতে পারে। যা অতীত অভিজ্ঞতা থেকে অনেকটা নিশ্চিত হয়েই সাধারণ মানুষ বলতে পারে। সম্প্রতি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও তার আলামত পাওয়া গেছে। এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত দুই দফা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে ইতিমধ্যে অর্ধশত মানুষের নির্বাচনী সহিংসতায় প্রাণহানি ঘটেছে।

    নির্বাচন এখন আর গণতন্ত্রচর্চার অন্যতম প্রধান প্রক্রিয়া নয়। নির্বাচন এখন কৌশল এবং চক্রান্তের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে যত কৌশলে এবং চতুরতায় পটু, নির্বাচনে বিজয় এখন তাদের পক্ষে অনেকটা নিশ্চিত। জনগণের ভোটে এখন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন না। কৌশল, চাতুর্য, অর্থবল এবং জনবল এখন নির্বাচনে জেতার আসল শক্তি। এসব শক্তিতে যারা যত বলীয়ান, নির্বাচনের ফলাফল তাদের পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা তত উজ্জ্বল। তাই এখন ‘সকল শক্তির উৎস জনগণ’ বলা হলেও সেই চর্চায় কেউ সময় নষ্ট করতে চায় না। মোক্ষলাভের ‘মৌলিক অস্ত্র’ প্রয়োগেই অধিক মনোযোগী সবাই।

    তাই নির্বাচন এখন আর জনগণের জন্য উৎসব নয়। মূর্তিমান আতঙ্ক। জানমাল সব হারানোর ভয়। বাংলার মানুষ গণতন্ত্রের নামে আর সন্ত্রাস-সহিংসতা দেখতে চায় না। মানুষ চায় শান্তি। গণতন্ত্রের সঠিক ও সুস্থ চর্চা। চায় পরিবার-পরিজন নিয়ে স্বস্তিতে জীবনযাপন করতে। বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচনকে আবার উৎসব হিসেবে দেখতে চায়। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী আর জাতির জনকের জন্মশতবর্ষে এটুকু চাওয়া মনে হয় খুব বেশি চাওয়া নয়।