প্রবাসীদের জন্য জাতীয় সংসদে ৩০টি সংরক্ষিত আসন চাই

     এম এম শাহীন 
    জাতিসংঘের ৭৬তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে নিউইয়র্কে সুস্বাগত। জাতিসংঘের বাংলাদেশ মিশন সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বরাবরের মতো এবারও তিনি বাংলায় বক্তব্য দেবেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা, আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে অর্জন এবং স্বাস্থ্য খাতের সাফল্যের বিষয় তুলে ধরবেন। সেই সঙ্গে বিশ্ব শান্তি, নিরাপদ অভিবাসন, করোনাভাইরাসের টিকার ন্যায্যতাভিত্তিক বণ্টন, বৃহৎ পরিসরে করোনা ভ্যাকসিন উৎপাদনের লক্ষ্যে পেটেন্টসহ মেধাস্বত্ব উন্মুক্তকরণ, ফিলিস্তিনি ও বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক সংকট, জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্পর্কিত বিষয়গুলো তুলে ধরবেন।
    বাংলাদেশের দীর্ঘ ৫০ বছরের ইতিহাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই একমাত্র ব্যক্তিত্ব, যিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সর্বাধিক ১৮ বার ভাষণ দিতে চলেছেন। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।
    মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয় অবগত আছেন, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে শতাব্দীর ভয়াবহ মহামারি করোনাভাইরাসের মরণছোবল-প্রতিটি দুঃসময়ে, দুর্যোগে, দুর্বিপাকে, ঘূর্ণিঝড়ে, সাইক্লোনে, বন্যায়, খরায়, ভূমিকম্পে এমনকি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংকটে প্রবাসীরা ছায়ার মতো দেশবাসীর পাশে দাঁড়িয়েছেন। আবার বাংলাদেশের যেকোনো উৎসব, যেমন বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি, বাংলা নববর্ষ, বৈশাখী মেলা প্রভৃতি সাড়ম্বরে যথাযথ মর্যাদায় উদ্্যাপন করে বিদেশের মাটিতে বাংলার সংস্কৃতিকে তুলে ধরছেন।
    মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপ, এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা নানা সংস্থা গঠন করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন। প্রবাসীরা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অ্যাম্বুলেন্স, মূল্যবান ওষুধপত্র, হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, বিপুল পরিমাণ কাপড়চোপড় কিনে পাঠিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য উন্নতমানের অস্ত্র ও খাদ্য কিনে পাঠান তারা। এ ছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ফলে মুক্তিযোদ্ধারা সঞ্জীবনী শক্তি লাভ করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও যেকোনো সংকটে প্রবাসীরা ফান্ড গঠন করে দেশের মানুষকে দুর্যোগের কবল থেকে রক্ষা করতে অসামান্য অবদান রাখছেন।
    শুধু সংকটকালে নয়, বিগত ৫০ বছর ধরে বিশ্বের নানা প্রান্তে অবস্থানরত প্রবাসীরা দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিতে বিরাট ভূমিকা রেখে চলেছেন। বাংলাদেশের রাজস্ব আয়ের দ্বিতীয় খাতই আসে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স থেকে। করোনা মহামারির এই সংকটময় সময়েও প্রবাসীরা রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে পাঠাচ্ছেন। প্রবাসীরা কেবল নিজেদের পরিবার আর দেশকে সমৃদ্ধ করে আত্মতৃপ্তি নিয়ে বসে নেই। তারা দেশে সুন্দর সমাজ গড়ার নেপথ্যেও কাজ করছেন। দেশের জেলা, উপজেলা, শহর, ইউনিয়ন, গ্রাম পর্যায়ে প্রবাসীরা বিভিন্ন সংগঠন ও সমিতি কিংবা ব্যক্তি উদ্যোগে নিজ নিজ এলাকার মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, খেলাধুলা ও সংস্কৃতির বিকাশে বিশাল অবদান রাখছেন।
    নিজ দেশকে বিশ্বের দরবারে গৌরবান্বিত করার ক্ষেত্রেও প্রবাসীদের জুড়ি মেলা ভার। আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই বাংলাদেশিদের অবস্থান রয়েছে। বাংলাদেশিরা যে কেবল শ্রমিক হিসেবেই কাজ করছেন, তা নয়। পৃথিবীর ছোট-বড় দেশগুলোতে আজ প্রবাসী বাংলাদেশিরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উদ্যোক্তা, শিক্ষক, গবেষক, আইনজীবী, বিজ্ঞানী, সাংবাদিক হিসেবে দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে কাজ করে চলেছেন। বাংলাদেশিরা আজ ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মূলধারার রাজনীতিতে অংশ নিয়েও বিরাট সফল। তারা ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশে নিজেদের সেবা কার্যক্রমের মাধ্যমে সেসব দেশের জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করে মানুষের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছেন।
    পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে স্থায়ী নিবাস গড়ে বাংলাদেশিরা সেখানকার অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ ও প্রশাসনে একটি শক্ত ভিত তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। এর মাধ্যমে তারা দেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশের সেতুবন্ধ তৈরিতে ভূমিকা রাখছেন। দ্বিতীয় প্রজন্মের মেধাবী প্রবাসীরাও শিক্ষা, চিকিৎসা, গবেষণাসহ নানা ক্ষেত্রে প্রভূত সাফল্য অর্জন করছেন। তাদের মধ্যে আবার অনেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ শেষে দেশে ফিরে বিদেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশকে অগ্রগতির পথে নিয়ে যাচ্ছেন। তাদের অনেক আইডিয়া কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশসহ নানা দেশ উপকৃত হচ্ছে।
    আমার বিশ্বাস, মেধাবী প্রবাসীরা বিদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে সক্ষম হবেন। এ জন্য দরকার তাদের একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখান থেকে তারা দেশসেবার কাজটি করতে উদ্বুদ্ধ ও আগ্রহী হবেন। আজ আমি প্রধানমন্ত্রী বরাবর প্রবাসী ও দেশবাসীর স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রস্তাব উত্থাপন করছি :
    এক. প্রবাসে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন পেশায় অভিজ্ঞ ৩০ জন ব্যক্তিকে বিভিন্ন মহাদেশ থেকে বাছাই করে ৩০টি সংরক্ষিত আসনে মনোনীত করে জাতীয় সংসদে ভূমিকা পালনের সুযোগ দেওয়া হোক। উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য ৫০টি আসন সংরক্ষিত আছে। এটা খুবই প্রশংসনীয় একটি উদ্যোগ। এই নারীদের মাধ্যমে দেশের নারীসমাজ যেমন ব্যাপক উপকৃত হচ্ছে, পাশাপাশি দেশও এগিয়ে যাচ্ছে। গত ৯ জুলাই ২০১৮, জাতীয় সংসদে সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধন বিল পাস হয়। আরো ২৫ বছরের জন্য ৫০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত রেখে ১৯৭২-এর মূল সংবিধানের ৬৫(৩) অনুচ্ছেদের বিধানে পরিবর্তন এনে বিলটি ২৯৫ ভোটে পাস হয়।
    দুই. সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের ‘সংসদে নির্বাচিত হইবার যোগ্যতা ও অযোগ্যতা’(১) উপধারাটি সংশোধন করে যারা জন্মসূত্রে বাংলাদেশি কিন্তু বর্তমানে অন্য দেশের সিটিজেন, এমন প্রবাসীদের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান করা হোক।
    অন্তত ১০ বছর মেয়াদে এই আইন সংশোধন করে বর্তমান সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার জাতীয় সংসদে প্রবাসীদের জন্য ৩০টি আসন সংরক্ষিত রাখলে প্রবাসীরা নিজেদের সম্মানিত মনে করবেন এবং দেশের প্রতি তাদের দায়বোধ আরো বেড়ে যাবে। আর বাংলাদেশি প্রবাসীরা জাতীয় সংসদে ভূমিকা পালনের সুযোগ পেলে ভিন দেশের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তারা সততার সাথে দেশ ও এলাকার জন্য বিরাট অবদান রাখতে সক্ষম হবেন বলে আমি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী। এই প্রতিনিধিদের মাধ্যমে একদিকে যেমন প্রবাসীরা উপকৃত হবেন, তেমনি দেশবাসীও এর কাক্সিক্ষত সুফল পাবেন বলে আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি।
    আমার প্রস্তাব দুটি সুবিবেচনার জন্য বর্তমান প্রবাসবান্ধব আওয়ামী লীগ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার প্রতি সবিনয়ে অনুরোধ জানাচ্ছি।
    পরিশেষে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর ২৪ সেপ্টেম্বরের বাংলা ভাষণ বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় উজ্জ্বল দিশারি হোক-এই প্রত্যাশা করছি।
    লেখক : সাবেক এমপি এবং সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি, ঠিকানা।