বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্টদের সমর্থন আমাকে জয়ী হতে সহায়তা করবে

    সাক্ষাৎকারে ফেলাসিয়া সিং

    নাশরাত আর্শিয়ানা চৌধুরী  নিউইয়র্কের সিটি কাউন্সিল নির্বাচনে ডিস্ট্রিক্ট-৩২ থেকে কাউন্সিলওম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাউথ এশিয়ান ইমিগ্র্যান্ট আমেরিকান ফেলিসিয়া সিং। একজন ট্যাক্সিচালকের মেয়ে ফেলিসিয়া পেশায় শিক্ষক। জুনের প্রাইমারি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ডেমোক্র্যাটিক দলের চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন। আগামী ২ নভেম্বরের চূড়ান্ত ভোটে জয়ের লক্ষ্যে চালিয়ে যাচ্ছেন ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা। ভোটারদের ডোর টু ডোর নক করছেন। তার নির্বাচনী ক্যাম্পেইনও চালাচ্ছে প্রচারণা। বাংলাদেশি কমিউনিটিসহ বিভিন্ন কমিউনিটির সমর্থন ও ভোট পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি। তবে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশি কমিউনিটিকে। কারণ প্রাইমারি নির্বাচনে তার জয়ে বাংলাদেশি ভোটাররা বড় ভূমিকা রাখেন। ইতিমধ্যে বিভিন্ন কমিউনিটি, সংগঠন ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির এনডোর্স ও সমর্থন পেয়েছেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস, চূড়ান্ত নির্বাচনে প্রাইমারি নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের চেয়েও বেশি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হবেন। গত ১১ অক্টোবর সকালে ঠিকানার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ফেলিসিয়া সিং।
    নির্বাচনী প্রচারণা কেমন চলছে জানতে চাইলে ফেলিসিয়া বলেন, প্রচারণা খুবই ভালো চলছে। আমার নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ কাজ করছেন, তারা আমাকে সমর্থন করছেন। আমরা ডোর টু ডোর টু নক করছি। পাশাপাশি বিভিন্ন উপায়ে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছি।

    নিউইয়র্ক: কমিউনিটির একটি অনুষ্ঠানে ফেলিসিয়া সিং।

    ভোটারদের কাছ থেকে কেমন রেসপন্স পাচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, খুবই ভালো রেসপন্স পাচ্ছি। ভোটাররা আমাকে পছন্দ করছেন। আমি একজন টিচার। আমি একজন ইমিগ্র্যান্ট এবং আমি একজন সাউথ এশিয়ান। সব সময় পরিশ্রম করি। আমি মানুষের জন্য কাজ করতে চাই।
    প্রাইমারি নির্বাচনের মতো চূড়ান্ত নির্বাচনেও জয়ের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে ফেলিসিয়া বলেন, এলাকার ভোটারদের প্রতি আমার বিশ্বাস আছে। তারা আমাকে এবারও প্রাইমারি নির্বাচনের মতোই জয়ী করবেন এবং কাজ করার সুযোগ দেবেন। আমার নির্বাচনী এলাকাটি রিপাবলিকান অধ্যুষিত। কিন্তু প্রাইমারি নির্বাচনে আমি ভোটারদের কাছ থেকে যে রকম সাড়া পেয়েছি, তাতে আমার বিশ্বাস, চূড়ান্ত নির্বাচনে আরো বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হব।
    ভোটারদের তার পক্ষে আকৃষ্ট করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ভোটারদের আমার অ্যাজেন্ডাগুলো জানাচ্ছি। আমার ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা সম্পর্কে তাদের অবহিত করছি। ভোটারদের ভোট দিতে উৎসাহিত করছি। আমরা বাংলা, হিন্দি, পাঞ্জাবি, চায়নিজসহ বিভিন্ন ভাষায় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলছি। আমার ক্যাম্পেইন টিমে বিভিন্ন ভাষার মানুষ রয়েছেন। আমার এলাকায় যেসব কমিউনিটির ভোটার বেশি, সেসব ভাষার লোকজনই আমার ক্যাম্পে রয়েছেন। আমার ক্যাম্পেইনের কর্মীরা ভোটারদের নিজ নিজ ভাষায় কথা বলছেন এবং তাদেরকে আমার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত করছেন। আশা করছি, ভোটাররা আমাকে সমর্থন দেবেন।

    আমি ভোটারদের এটাও বলছি, আমি একজন ইমিগ্র্যান্ট, একজন টিচার, একজন ট্যাক্সিচালকের মেয়ে। তাদের বোঝাচ্ছি, সিটি হলে আরো বেশি বেশি টিচার প্রতিনিধি দরকার। আমি এখন নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে ব্যস্ত থাকায় ক্লাসে যেতে পারছি না। কোনি আইল্যান্ডের একটি স্কুলে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষকতা করছি।
    নিজ নির্বাচনী এলাকা সম্পর্কে ফেলিসিয়া সিং বলেন, ১৩টি এলাকা নিয়ে ডিস্ট্রিক্ট-৩২ গঠিত। এর মধ্যে রয়েছে হাওয়ার্ড বিচ, ওজোন পার্ক, বেল হারবার, ব্রিজি পয়েন্ট, ব্রড চ্যানেল, রকওয়ে পার্ক, নেপোনসিট, রক্সবারি, সাউথ ওজোন পার্ক, রিচমন্ড হিল এবং উডহ্যাভেনের অংশ। জ্যাকব রাইস পার্ক, ফোর্ট টিলডেন, ব্রিজি পয়েন্ট টিপ, স্প্রিং ক্রিক পার্ক এবং জ্যামাইকা বে ওয়াইল্ডলাইফ রিফিউজের অধিকাংশই এই ডিস্ট্রিক্টের মধ্যে অবস্থিত। এখানে কুইন্স কমিউনিটি বোর্ড ৯, ১০ ও ১৪ এবং নিউইয়র্কের ৫, ৬, ৭ ও ৮ কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট রয়েছে। এটি নিউইয়র্ক স্টেট সিনেটের ১০, ১২ ও ১৫তম জেলা এবং নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির ২৩, ২৮, ৩১ ও ৩৮তম ডিস্ট্রিক্টের অন্তর্ভুক্ত।
    ডিস্ট্রিক্ট-৩২-এ ভোটারসংখ্যা কত এবং এর মধ্যে কত বাংলাদেশি ভোটার রয়েছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে অনেক মানুষের বসবাস। ৫২ হাজার ডেমোক্র্যাটিক ভোটার রয়েছেন। রিপাবলিকানও আছেন অনেক। এর বাইরে ইন্ডিপেন্ডেট ভোটারও আছেন। তবে বাংলাদেশি ভোটারের সঠিক সংখ্যা বলতে পারছি না। বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ভোটার ডিস্ট্রিক্ট-৩২-এ থাকেন। আমার ধারণা ১০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি ভোটার আছেন। তারা আমাকে প্রাইমারি নির্বাচনে সমর্থন ও ভোট দিয়েছেন। আমার জয়ের পেছনে তাদের অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে। এ কারণে আমি বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্ট কমিউনিটির কাছে ভীষণ কৃতজ্ঞ। আশা করছি, এবারের সাধারণ নির্বাচনেও বাংলাদেশিরা আমাকে সমর্থন ও ভোট দেবেন। পাশাপাশি ইন্ডিয়ান, সাউথ এশিয়ান এবং এশিয়ান ভোটারদের বেশির ভাগ প্রাইমারিতে আমাকে সমর্থন দিয়েছেন। আশা করছি, এবারও তাদের সমর্থন পাব।
    নির্বাচনী এলাকার সবাই কি ভোট দিতে যাবেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আসলে সবাই ভোট দিতে যান না। তবে আমি আশা করছি, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ ভোট দিতে যাবেন এবং তারা আমাকে ভোট দিয়ে জয়ী করবেন।
    নির্বাচনে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সম্পর্কে ফেলিসিয়া বলেন, আমার মূল প্রতিদ্বন্দ্বীও একজন নারী। তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী জোয়ান অ্যারিওলা। আরেকজন ইন্ডিপেন্ডেন্ট। তিনি হলেন ক্যানোচি উইলসন। তারাও প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে আমার বিশ্বাস, আমিই জয়ী হব।
    ভোটারদের প্রতি আপনার কোনো বার্তা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ভোটারদের প্রতি মেসেজ দিতে চাই যে আমি একজন শিক্ষক। সিটি হলে আরো বেশি বেশি শিক্ষক প্রতিনিধি যাওয়া দরকার। শিক্ষক প্রতিনিধিরা সিটি হলে গেলে আমরা সবার সমস্যার কথা বেশি করে বলতে পারব এবং সমস্যার সমাধানের জন্য কাজ করতে পারব। আমি এখানে ইমিগ্র্যান্ট। আমার মতো যারা ইমিগ্র্যান্ট, তারা আসলে কমবেশি সবাই জানেন ইমিগ্র্যান্টদের সমস্যাগুলো কী কী এবং এগুলোর সমাধান হওয়া প্রয়োজন। আমি ইমিগ্র্যান্ট হওয়ার কারণে তাদের সমস্যাগুলো আমার সব জানা আছে। সেভাবে আমি আগামী দিনের কাজের পরিকল্পনা করেছি। আশা করছি, তারা ভোটের দিনে ভোটকেন্দ্রে যাবেন এবং ভোট দিয়ে আমাকে জয়ী করবেন।
    আপনার নির্বাচনী অ্যাজেন্ডার মধ্যে কী কী রয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার নির্বাচনী অ্যাজেন্ডার মধ্যে অনেক কাজ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষা। আমি চাই শিক্ষা খাতে আরো সুযোগ বাড়ানো হোক। আমি চাই, আমাদের শিশুরা এমন এক জগতে বড় হয়ে উঠুক, যেখানে তাদের ভালোবাসা, সমর্থন ও সফলতার সকল সরঞ্জামের পাশাপাশি ন্যায়সংগত শিক্ষা প্রদান করা হয়। এ ছাড়া স্মল বিজনেসগুলো অনেক ধরনের সাফার করে। তাদের সাহায্য-সহযোগিতা দরকার। আমি স্মল বিজনেসকে সহায়তা করতে কাজ করব। এনভায়রনমেন্টাল প্রোগ্রাম আমার একটি বড় প্রোগ্রাম। জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগত স্থিতিস্থাপকতা, পরিবহন শ্রমিক ও ট্যাক্সি ড্রাইভারদের নিরাপত্তা, কমিউনিটির সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, আবাসন সমস্যার সমাধান, গৃহহীনতার শিকার ব্যক্তিদের সহায়তা করা, স্বাস্থ্যসেবা এবং চিকিৎসা, দামে স্বচ্ছতা, যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যের যত্ন, মাতৃক ও পেরিনেটাল মৃত্যুহারের সমাপ্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করতে চাই। এ ছাড়া এবারের ঘূর্ণিঝড় ও বন্যায় মানুষের বাসাবাড়িতে পানি উঠেছে। অনেক সম্পদ ও ভবন ড্যামেজ হয়েছে। এই বন্যায় মানুষের অনেক ক্ষতি হয়েছে। নিউইয়র্কের এই সমস্যাটি সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। নিউইয়র্কে বন্যার পানির নিষ্কাশন ব্যবস্থাসহ আর যাতে কোনো মানুষের সম্পদের ক্ষতি না হয়, সে জন্য যত দ্রুত সম্ভব উদ্যোগ নিতে হবে। এ ছাড়া ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাসহ আমার আরো বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা রয়েছে। আমি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছি। আশা করছি সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারব।
    একজন নারী ক্যান্ডিডেট হিসেবে কোনো চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন কি না- এ ব্যাপারে তিনি বলেন, আসলে নির্বাচনে অংশ নেওয়া একটি কঠিন বিষয়। কারণ এটাকে সফল করতে হলে অনেক কষ্ট করতে হয়। আমি একজন নারী, আমার প্রতিদ্বন্দ্বীও একজন নারী প্রার্থী। আমরা ভোটারদের যে যার মতো করে ভোটদানে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছি। কে কী কাজ করব, সেগুলো বলছি। তবে বড় ধরনের কোনো সমস্যা নেই। আমি একজন অবিবাহিত মেয়ে। এখন যে পারিবারিক সমর্থন পাচ্ছি, সেটি আমার বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাচ্ছি। আমি তাদের কাছে এ জন্য কৃতজ্ঞ। তারা আমাকে আমার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সব রকমের সহযোগিতা দিচ্ছেন। আসলে সাহস, উৎসাহ দেওয়া এবং মানসিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার সাপোর্টও অনেক বড় সাপোর্ট।
    ভোটারদের প্রতি তার বিশেষ কোনো বার্তা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি সবার উদ্দেশে বলব, প্লিজ আপনারা ভোট দিতে আসুন। পরিবারের সদস্য এবং পরিচিতজনদের ভোট দিতে বলুন। ২ নভেম্বর ইনপারসন ভোট দিন। কেউ যদি সেদিন যেতে না পারেন, তাহলে আর্লি ভোট দিন। ২৩ অক্টোবর থেকে আর্লি ভোট শুরু হবে। ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত অ্যাবসেন্টি ব্যালটের জন্য অনুরোধ করা যাবে।
    ইয়ং জেনারেশন ভোটদানের ব্যাপারে কতখানি আগ্রহী জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা আগ্রহী আছে। আমার এলাকায় ইয়ং জেনারেশন ভোটার আছে, যারা এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভোট দেবে। আমার ক্যাম্পেইন গ্রুপেও ইয়ং জেনারেশন কাজ করছে। আমিও উৎসাহিত করার চেষ্টা করছি, যাতে নতুনরা আরো বেশি বেশি করে ভোট দিতে আসে। তিনি বলেন, আমার এলাকার বেশির ভাগ ভোটারের বয়স ৪৫-৫০ বছর। তারাও ভোট দিতে আসবেন বলে আশা করছি। আমি আমার ভোটারদের অনুরোধ করব, আপনারা ভোট দিলে ডেমোক্র্যাটরা এই আসনে জয়ী হবে। তাই ভোটে আপনাদের অংশগ্রহণ খুবই জরুরি।