বাংলার বিদ্রোহী বারো ভুঁইয়া ইতিহাস ও মিথ-১

    ওয়াকিল আহমদ :

    প্রস্তাবনা
    বাংলার বিদ্রোহী বারো ভুঁইয়াদের সম্বন্ধে অনেক লেখালেখি হয়েছে। তার পরও কেন আমি লিখছি, এমন প্রশ্ন উঠতে পারে। ইতিহাস নিয়ে গ্রন্থ-প্রবন্ধ রচনা কখনো থেমে থাকে না। বাংলার ইতিহাস সম্বন্ধে দেশি-বিদেশি বহু লেখক-গবেষক মূল্যবান গ্রন্থ-প্রবন্ধ প্রণয়ন করেছেন। রচনার ধারা আজও বন্ধ হয়নি। তথ্য-উপাত্ত ও মূল্যায়নের দিক থেকে প্রতিটি গ্রন্থের কিছু না কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য থাকে। অজানা কোনো নতুন তথ্য থাকলে তো কথাই নেই। আমরা নতুন কোনো তথ্য দিতে পেরেছি, এমন দাবি করি না। তবে নতুনভাবে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছি, তা বলতে পারি। বিভিন্ন সময়ে নানা লোকের নানা মতের ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বাংলার বিদ্রোহী বারো ভুঁইয়াদের ব্যাপারে অনেক বিষয়ের জট ও জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। কোনো কোনো বিষয় ধূম্রাচ্ছন্ন রয়েছে, বিকৃত হয়েছে অনেক। সেখানে ইতিহাস, সাহিত্য, কিংবদন্তি মিলে একাকার হয়ে আছে। আমরা ইতিহাস, সাহিত্য, কিংবদন্তিকে আলাদাভাবে বিচার করে সত্য রূপটা জানতে চাই।

    দ্বিতীয়ত, একেকজন ভুঁইয়া সম্পর্কে স্বতন্ত্রভাবে অনেক লেখালেখি হয়েছে, কিন্তু সবাইকে নিয়ে একত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সার্বিক আলোচনাপুস্তক খুব কমই রয়েছে। আমরা ভারসাম্যহীন, অসামঞ্জস্য ও খণ্ডিত নয়, পূর্ণাঙ্গ চিত্র চাই।

    তৃতীয়ত, বারো ভুঁইয়া বলতে তো আর বারো জন ভুঁইয়াকে বোঝায় না, দুই প্রজন্ম মিলে তাঁদের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। মূল দ্বন্দ্ব ছিল মুঘলে-পাঠানে; তাঁদের মধ্যে এই সংগ্রাম প্রায় দুই প্রজন্ম ধরে প্রলম্বিত হয়। দ্বিতীয় প্রজন্মের অনেকেই বিদ্রোহী ভুঁইয়ারূপে আখ্যাত হয়েছেন। আমি এসব বিষয় নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে সমান গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা ও বিচার-বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি।

    দেশের অতীত ইতিহাস, বিশেষ করে রাজা-বাদশাহর জীবনকথা অনেক রোমাঞ্চকর ও রহস্যময়। বারো ভুঁইয়ারা আমাদের শুধু পূর্বপুরুষ ছিলেন না, সীমিত অর্থে রাজপুরুষও ছিলেন। সেকালের স্থানীয় প্রজারা তাঁদের ‘রাজা’ বলেই জানত ও মান্য করত। একালের গবেষকেরা তাঁদের ‘ছোট রাজা’ (little kings) বলেছেন। নিজ নিজ অঞ্চলের স্বাধীনতারক্ষার জন্য তাঁদের সংগ্রামী ভূমিকা খুবই প্রশংসনীয় ছিল। কারও কারও ভূমিকা ছিল অত্যন্ত দুঃসাহসিকতাপূর্ণ ও বিস্ময়কর। এ প্রসঙ্গে ইতিহাসবিদ এমআই বোরাহ মূলের ইংরেজি অনুবাদে যা বলেন, তা হলো :

    ‘১৫৭৬ সালে পাঠান সুলতান দাউদ খান কররানি রাজমহলের যুদ্ধে মুঘলদের কাছে পরাজিত ও নিহত হলে বাংলা মহামতী মুঘল সম্রাট আকবরের অধীন হয়। এরপর শুরু হয় বাংলার ইতিহাসের এক আশ্চর্যজনক অধ্যায়, যখন অর্ধস্বাধীন হিন্দু-মুসলমান মুখ্য ভুঁইয়াগণ (semi-independent landlord chiefs) মিলিতভাবে মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এক বিস্ময়কর যুদ্ধে লিপ্ত হন। বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সম্রাটের বিরুদ্ধে রাজাহীন (kingless country) একটি দেশের যুদ্ধের এই চমকপ্রদ ইতিহাস এখনো বলার অপেক্ষায় রয়েছে।’

    এমআই বোরাহ মির্জা নাথানের ফারসি ‘বাহারিস্তান-ই-গায়বি’ গ্রন্থের (১৬২৭-৩৩) ইংরেজি অনুবাদের ‘প্রস্তাবনা’য় বাংলার বিদ্রোহী বারো ভুঁইয়াদের সংগ্রামী ইতিহাস সম্বন্ধে এরূপ মন্তব্য করেন। তাঁর গ্রন্থের প্রকাশকাল ১৯৩৬ সাল। বলা বাহুল্য, বাংলার ‘অর্ধস্বাধীন হিন্দু-মুসলমান ভুঁইয়াগণে’র বিদ্রোহ ও সংগ্রামের চমকপ্রদ ইতিহাস আমাদেরকেও বিস্মিত ও বিমুগ্ধ করে। জাতির জন্য প্রতিটি ঐতিহাসিক ঘটনার কিছু না কিছু শিক্ষা থাকে। বারো ভুঁইয়াদের ইতিহাস থেকেও শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। সেই শিক্ষাটি কী, আমরা তাও জানার ও তাকে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

    উনিশ ও বিশ দুই শতকের ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক পণ্ডিত এবং গবেষকেরা বারো ভুঁইয়াদের বিষয়ে বাস্তব ও কাল্পনিক নানা কথা বলেছেন। বাস্তবটা ইতিহাস, কল্পনাটা ‘মিথ’ বা মিথ্যা। আমরা বলেছি, আমাদের মূল প্রতিপাদ্য হলো ইতিহাসের সত্যকে যাচাই করা। সত্যকে কতখানি গিল্টি করা হয়েছে, তা চেনা ও বোঝার জন্য প্রচলিত মিথের কথাও বলেছি। মিথ মিথ্যা হলেও মূল্য আছে। মিথ তৈরি হয় উদ্দেশ্য থেকে। কোনো কোনো মিথ সত্যকে কলঙ্কিত করে। সিরাজউদ্দৌলার ‘ব্ল্যাকহোল’ মিথ; আবার কোনো মিথ সত্যকে আদর্শায়িত বা মহিমান্বিত করে। লোকপ্রচলিত কিংবদন্তি, ঐতিহাসিক উপন্যাস ও নাটকে এরূপ প্রবণতা লক্ষ করা যায়। কোনো কোনো মিথের পরিসর অনেক বড়Ñব্যক্তির গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসে। বাংলা উপন্যাস-নাটকে নবাব সিরাজউদ্দৌলা, রাজা প্রতাপাদিত্য, বীর হাম্বির, সীতারাম রায়, এমনকি বর্গি তস্কর ভাস্কর পণ্ডিতও বীরপুরুষ ও স্বাধীনতার প্রতীক রূপে চিত্রিত হয়েছেন। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেরণা জোগাতে ‘বীরপুরুষ’ চাই। স্বদেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে মধুসূদন দত্ত শাস্ত্রকথিত ‘অধর্মাচারী’ ও ‘পাপিষ্ঠ’ রাবণকেও বীরপুরুষ রূপে চিত্রিত করেছেন ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’। সত্য হোক মিথ্যা হোক, এককালের পাঠক-দর্শক তাঁদের বীরপুরুষ রূপেই জেনেছেন এবং বীররসে উদ্বুদ্ধ-উদ্বেলিত হয়েছেন।

    ইতিহাস হোক, ঐতিহাসিক উপন্যাস-নাটক হোকÑএসব রচনা করার ঝুঁকি থেকে যায়। ইতিহাস বিকৃত করলে এরূপ ঝুঁকি আরও বাড়ে। ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক, কাউকে আদর্শায়িত করা অথবা কাউকে কলঙ্কিত করা উভয়ই বিকৃতির পর্যায়ে পড়ে। অতীতে ইতিহাসকে এরূপে বিকৃত করে অনেকে কলঙ্কের ভাগী হয়েছেন। আমরা সে ঝুঁকি নিতে চাই না। আমরা ইতিহাসের কথা বলেছি, ইতিহাস নিয়ে রচিত উপন্যাস-নাটক ও প্রচলিত কিংবদন্তির কথাও বলেছি সত্যকে যাচাই করার জন্য। আর এখানেই রয়েছে আমাদের বক্তব্যের মৌলিকতা।

    আজ থেকে ৫০০ বছর পূর্বে বাংলার মাটিতে বারো ভুঁইয়াদের অভ্যুত্থান ঘটে। এ যুগে আমাদের চোখে তাঁরা শুধু বারো জন ভুঁইয়া ছিলেন না, বারোটি স্বপ্ন ছিলেন; বারোটি টুকরো টুকরো স্বপ্ন, স্বাধীনতার স্বপ্ন। ভুঁইয়াগণ সেই স্বপ্নের প্রতীক ছিলেন। সমসাময়িক ঐতিহাসিক মির্জা নাথান মুসা খান ও স্থানীয় জমিদারদের স্বাধীনতার অদম্য স্পৃহাকে ‘বৃথা আশা’ (fales hopes) এবং ‘অলস স্বপ্ন’ (idle dreams) বলেছেন। তিনি দাম্ভিক ভাষায় লেখেন :

    ‘he (Islam Khan) would personally march to Bhati in order to punish Musa Khan and the Zamindars of that region who have raising the head of arrogance due to their false hopes; and he proposed to bring them to their senses from their idle dreams, with the inflictions of necessary chastisement.Õ [Baharistan-i-Ghaybi, Vol. I, p. 9]

    মির্জা নাথান খাজা উসমানের স্বাধীনতার অনির্বাণ আকাক্সক্ষাকে ‘উদ্ধত স্বপ্ন’ও (arrogant dreams) বলেছেন। (ঐ, পৃ. ১৫৯]। বিরোধী দলের বিপক্ষে থেকে নিজ দলের সমর্থক হয়ে মির্জা নাথানের চোখে যা ছিল ‘অলস স্বপ্ন’, ‘উদ্ধত স্বপ্ন’, মুসা খান ও খাজা উসমানের চোখে তা ছিল অন্তর্লালিত জ্বলন্ত স্বপ্ন, যার জন্য তাঁরা জীবন বাজি রেখে দিন নয়, মাস নয়, বছরের পর বছর ধরে বহু রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করেছেন। এ ছিল তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব। প্রায় অর্ধশতক বছর (১৫৭৬-১৬১৩) ধরে কত যুদ্ধ হয়েছে, কত রক্ত ঝরেছে? উত্তর-পশ্চিমে ভূষণা থেকে দক্ষিণ-পূর্বে ভুলুয়া এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে হিজলি থেকে উত্তর-পূর্বে উহার পর্যন্ত বাংলার বিস্তৃত ভূখণ্ড ছিল ভুঁইয়াদের বিচরণভূমি। আকবরের ‘সাঁড়াশি আক্রমণে’, বিশেষত ইসলাম খান চিশতির ‘চিরুনি অভিযানে’ (combing operations) সারা বাংলা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। কাটাসগড় যুদ্ধের বর্ণনার শেষে মির্জা নাথান কবিতার ভাষায় দুটি চরণ লিখেছেন এভাবে : ‘

    ‘The clashing noise of battle reached the sky
    The blood of the Bengalees flowed like river Jaihun.Õ [Ibid., p. 58]

    ‘আকাশ স্পর্শ করল রণ কোলাহল;
    জৈহুন নদীর মতো বাঙালির রক্ত হলো প্রবাহিত।’

    প্রবল পরাক্রান্ত মুঘলশক্তির তুলনায় নিজেদের ক্ষুদ্র ও অসমশক্তি নিয়ে তাঁরা যেভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলে সংগ্রাম করেছেন, ইতিহাসে তা যথার্থই বিরল। তাঁদের মূল প্রেরণা ছিল সেই স্বাধীনতার স্বপ্ন। ভুঁইয়াগণ অবিসংবাদিতভাবে স্বাধীনচেতা ও দেশপ্রেমিক ছিলেন। তাঁদের স্বাধীনতাপ্রীতিতে ও স্বদেশপ্রেমে কোনো খাদ ছিল না। আমাদের ধারণা, ইতিহাসের অন্তর্নিহিত সত্য রূপটি এখানেই নিহিত রয়েছে।

    বারো ভুঁইয়াদের স্বপ্নগুলো একত্র হলে কী হতো? আমাদের বিশ্বাস, বাংলার ইতিহাস স্বতন্ত্রভাবে লেখা হতো। শুধু প্রয়োজন ছিল একক নেতৃত্বের। স্বপ্ন জেগেছিল, প্রায় চার দশক ধরে টিকেও ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাস্তব রূপ নিতে পারেনি। তাঁরা স্বপ্ন দেখেছিলেন, কিন্তু যুগ-জাতি-সমাজ-মানুষ জাগেনি, ঘুমিয়েছিল। এমনও হতে পারে, তাঁরা সমাজকে জাগাতে পারেননি। আবার ভুঁইয়াদের বিপ্লব স্বতঃস্ফূর্ত হলেও অপরিকল্পিত, বিচ্ছিন্ন ও খণ্ডিত ছিল। তাই সবকিছু ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তাঁদের ব্যর্থতার ফলে বাংলার মানুষকে দুই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অধীনে দুইশ, প্রায় দুইশ করে চারশ বছর গোলামি করতে হয়েছে। এই চারশ বছর ধরে বাংলার কী পরিমাণ সম্পদ দিল্লিতে ও লন্ডনে গেছে, আমরা কখনো তার হিসাব করে দেখিনি। বাংলার কৃষক-শ্রমিকের শ্রমোপার্জিত সম্পদ পরদেশি প্রভুদের সুখ-সম্পদ বৃদ্ধি ও ভোগ-বিলাসিতা চরিতার্থ করেছে। কিন্তু নিজেরা ‘যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরে’ই থেকে গেছে; তাদের দুঃখ-দারিদ্র্য দূর হয়নি। হয়তো বাংলার মানুষ যখন একক নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম করেছে, তখন জাতির অভাবিতপূর্ব স্বপ্ন সফল হয়েছে। ১৯৭১ সালে তারা এমনিভাবেই জেগে মুক্তিযুদ্ধ করেছিল। সেদিন সবাই লড়েছে; সারা বাংলাদেশ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। সে লড়াইয়ে বাঙালি হার মানেনি, জয়ী হয়েছে; জয়ী হয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করেছে। বাংলাদেশ এখন আর ‘তলাহীন ঝুড়ি’ নয়, তলাযুক্ত পাত্র। তবে দুঃখের বিষয় এই যে, তা ছিদ্রমুক্ত নয়। ৫০ বছরে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের যেরূপ এবং যে পরিমাণ উন্নতি হওয়ার কথা ছিল, বাংলাদেশে তার সিকি ভাগও হয়নি। তার প্রধান কারণ দেশের সম্পদ দেশের উন্নয়নে ব্যয় হয়নি। কতক ধনী ব্যক্তির পকেট ভর্তি করেছে, আর বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। পাচার এখনো হচ্ছে; দেশের সম্পদ কতভাবে যে বিদেশে যাচ্ছে, তার ইয়ত্তা নেই। কতক ধনী ব্যক্তির উন্নয়ন তো দেশের সার্বিক উন্নয়ন নয়। সবাইকে একসাথে নিয়ে উন্নয়নই টেকসই উন্নয়ন। বাংলার সস্তা শ্রম কিনে নিয়ে দেশি-বিদেশি মালিকেরা ধনী হচ্ছে; শ্রমিকদের দুর্ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করলে গুলি খেয়ে মরে। হতে পারে, ইতিহাসের পূর্ণ শিক্ষা আমরা গ্রহণ করিনি। আমাদের দেশ আছে, দেশপ্রেম নেই। [চলবে]

    -ভার্জিনিয়া, ১৭ নভেম্বর ২০২১