বাতির তলদেশ বরাবরই আঁধার থাকে

    মুহম্মদ শামসুল হক :

    সর্বাধুনিক প্রযুক্তি, সভ্যতা ও সংস্কৃতির পাদপীঠ আমেরিকাকে বলা হয় নারী স্বাধীনতার ভিত্তিভূমি। প্রসূতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের খাতিরে এখানে নবজাতকের অভিভাবক হিসেবে জননীর নাম সরকারি তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হয়। প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার সর্বত্র লেডিস ফার্স্ট বা নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এমনকি নারীদের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা নিবেদন এবং বিশ্ববাসীর সজাগ দৃষ্টি আকর্ষণের নিমিত্তেই আমেরিকার স্ট্যাচু অব লিবার্টিকে মহিলার অবয়বে সুশোভিত করা হয়েছে। অবশ্য বাহ্যিক আচার-আচরণ এবং চলন-বলনে মহিলাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জিকির ওঠালেও ভেতরে ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রে মহিলাদের প্রতি পুুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থা চরম অবজ্ঞা ও অশ্রদ্ধা প্রদর্শন আসছে রাষ্ট্রটির অভ্যুদয়ের লগ্ন থেকেই।

    উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৫০ বছরের ইতিহাসে নিউইয়র্কসহ ২০টি স্টেটে একজন মহিলাও গভর্নর নির্বাচিত হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেননি। তবে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে নিউইয়র্কের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ডেমোক্র্যাটিক গভর্নর অ্যান্ড্রু ক্যুমো অভিসংশন এড়ানোর খাতিরে পদত্যাগ করায় লেফটেন্যান্ট গভর্নর ক্যাথি হোচুলের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়েছে। নিউইয়র্ক স্টেটের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ২৪ আগস্ট ২০২১, লেফটেন্যান্ট গভর্নর ক্যাথি হোচুল প্রথম মহিলা হিসেবে গভর্নরের আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ করেছেন। ফলে নিউইয়র্ক মহিলা গভর্নর বঞ্চিত অভিশাপ থেকে দায়মুক্ত হয়েছে। তা সত্ত্বেও আরকানসাস, ক্যালিফোর্নিয়া, কলারাডো, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, আইডাহো, ইলিনয়, ইন্ডিয়ানা, ম্যারিল্যান্ড, মিনেসোটা, মিসিসিপি, মিজৌরি, নেভাদা, নর্থ ড্যাকোটা, পেনসিলভানিয়া, টেনেসি, ভার্জিনিয়া, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া এবং উইসকনসিন অদ্যাবধি সেই অভিশাপের রাহুবন্ধনে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। মূলত বাতির তলদেশ বরাবরই আঁধার থাকে বিধায় মাতৃপূজারি আমেরিকায় নারী সম্প্রদায় এমনতর অভিশাপের গ্লানি বয়ে যাচ্ছে প্রায় ২৫০ বছর ধরে।

    নারী গভর্নরদের উত্থান : যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চলতি বছরের ২৪ আগস্ট পর্যন্ত আকস্মিক শূন্যতার কারণে দুজন অ্যাক্টিং গভর্নরসহ সর্বমোট ৪৪ জন পোড়খাওয়া মহিলা রাজনৈতিক যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেটে গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কেউ কেউ অদ্যাবধি গভর্নর পদে বহাল আছেন। এ ছাড়া তিনজন মহিলা করপোরেড-বহির্ভূত) ইউএস টেরিটরির গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নির্বাহ করেছেন কিংবা অদ্যাবধি করে যাচ্ছেন। আবার দুজন মহিলা ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়ার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন কিংবা অদ্যাবধি করছেন। আবার ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়ার মেয়র মুরিয়েল বৌশার ও গুয়ামের টেরিটরিয়াল গভর্নর লু লিয়ন গুয়েরেরোসহ বর্তমানে নয়জন মহিলা আমেরিকার স্টেট গভর্নরের দায়িত্ব অসামান্য দক্ষতার সাথে পালন করে যাচ্ছেন।

    যাহোক, ব্রিটিশ আধিপত্যবাদীদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বিতাড়িত করে ১৮৭২ সালে স্বাধীন-সার্বভৌম যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটলেও মহিলাদের গভর্নর পদে উত্থান সূচিত হয়েছিল ১৯০৯ সালে। অরেগনের জনপ্রিয় গভর্নর জর্জ আর্ল চেম্বারলেইন ইউএস সিনেটর নির্বাচিত হওয়ার পর শপথ গ্রহণের নিমিত্তে তাকে ওয়াশিংটন ডিসির উদ্দেশে যাত্রা করতে হয়েছিল ২৬ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার। গভর্নর ফ্রাঙ্ক ডব্লিউ বেনসন তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার কথা থাকলেও বেনসন হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। অগত্যা সাবেক গভর্নর আর্ল চেম্বারলেইন ওয়াশিংটনের উদ্দেশে যাত্রার পূর্বে তার সেক্রেটারি ক্যারলিন বি শেলটনের নিকট গভর্নরের দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। বি শেলটন ১৯০৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি শনিবার সকাল ৯টা থেকে ১ মার্চ সকাল ১০টা পর্যন্ত এক সপ্তাহের জন্য অ্যাক্টিং গভর্নরের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ১৩৭ বছরের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সংযোজন করলেন।

    এরপর ১৯২৪ সালে আবার দুই সপ্তাহের জন্য নিউ মেক্সিকোর অ্যাক্টিং গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেছিলেন ক্ষণজন্মা মহীয়সী রাজনীতিবিদ সলোডাড চেভেজ ডে চেকন। নিউ মেক্সিকোর ডেমোক্র্যাটিক দলীয় গভর্নর জেমস এফ হিনকল জাতীয় ডেমোক্র্যাটিক কনভেনশনে অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে নিউইয়র্কে আসতে বাধ্য ছিলেন। অন্যদিকে দুর্ভাগ্যক্রমে লেফটেন্যান্ট গভর্নর জোসে এ বেকাও ১৯২৪ সালের মে মাসে অকস্মাৎ মারা যান। অগত্যা গভর্নর হিনকল নিউ মেক্সিকো ত্যাগের আগে সেক্রেটারি অব স্টেট চেভেজ ডে চেকনের ওপর গভর্নরের দায়িত্ব অস্থায়ীভাবে ন্যস্ত করেন। দুই সপ্তাহ নিউ মেক্সিকোর অ্যাক্টিং গভর্নরের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে দূরদর্শী রাজনীতিবিদ ডে ডেকন নিউ মেক্সিকোর ইতিহাসে প্রথম মহিলা গভর্নরের মর্যাদায় ভূষিত হন।

    উইমিংয়ের গভর্নর উইলিয়াম বি রস ১৯২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে অকস্মাৎ পটল তুললেন। তার কার্যকালের বাকি মেয়াদের জন্য ১৯২৪ সালের ৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত বিশেষ নির্বাচনে বি রসের বিধবা পত্নী নেলি টেইলো রস প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম নির্বাচিত মহিলা গভর্নরের গৌরব অর্জন করেন। ১৯২৫ সালের ৫ নভেম্বর নেলি টেইলো রস মহিলা গভর্নর হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং উইমিংয়ের ইতিহাসে নবজাগরণের সূচনা করেন।

    টেক্সাসের গভর্নর জেমস এডওয়ার্ড বিভিন্ন অভিযোগে অভিসংশনের শিকার হন এবং ১৯১৭ সালে দপ্তর ত্যাগে বাধ্য হন। অথচ তার বিশেষ প্রতিভাসম্পন্না রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব স্ত্রী মিরিয়াম এ ফার্গুসান ১৯২৩ সালের ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে গভর্নর হিসেবে বিজয়ী হন। ১৯২৫ সালের ২০ জানুয়ারি মিরিয়াম এ ফার্গুসান গভর্নর হিসেবে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে প্রথম নারী গভর্নর হিসেবে টেক্সাসের ইতিহাসে স্থান করে নেন।

    ক্ষমতাচ্যুত গভর্নরের পত্নী কিংবা প্রয়াত গভর্নরের বিধবা পত্নী হিসেবে নয়, নিজস্ব গতিশীল নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতার সুবাদে কানেকটিকাটের ইতিহাসে প্রথম নারী গভর্নর হিসেবে স্থান করে নিয়েছিলেন এলা টি গ্রাসো। ১৯৭৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে প্রতিপক্ষকে ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে টি গ্রাসো ১৯৭৫ সালের ৮ জানুয়ারি কানেকটিকাটের ৮৩তম গভর্নর হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং ১৯৮০ সালের ৩১ ডিসেম্বর দপ্তর ত্যাগ করেন।

    ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি মন্টানার দ্বাবিংশ গভর্নর হিসেবে অভিষেক হয় মন্টানার ইতিহাসের প্রথম নারী গভর্নর জুডিথ হেলেন মার্টজের। দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালনের পর তিনি ২০০৩ সালের ৫ জানুয়ারি গভর্নরের দপ্তর ত্যাগ করেন।
    ২০০৪ সালের ১ জানুয়ারি কানেকটিকাটের ৮৭তম গভর্নর হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন দূরদর্শী রাজনীতিবিদ এবং সৃজনশীল নেতৃত্বের অধিকারী জডি রেল। দীর্ঘ ছয় বছর দোর্দণ্ড প্রতাপে এবং অভাবনীয় দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালনের পর জডি রেল ২০১১ সালের ৫ জানুয়ারি দপ্তর ত্যাগ করেন।

    ডেমোক্র্যাটিক দলীয় টিকিটে ডাকসাইটে রাজনীতিবিদ রুথ আন মিনার ২০০১ সালে ডেলাওয়ারের ৭২তম গভর্নর নির্বাচিত হন। অসামান্য নৈপুণ্যের সাথে দায়িত্ব পালন শেষে ২০০৯ সালে তিনি গভর্নরের দপ্তর ত্যাগ করেন। অনন্যসাধারণ প্রতিভাধর রুথ আন ডেলাওয়ারের ২৩তম লেফটেন্যান্ট গর্ভনরের দায়িত্বও পালন করেছিলেন।
    ইউটাহর ইতিহাসে প্রথম নারী গভর্নর ওলেন ওয়াকার স্টেটের পঞ্চদশ গভর্নর হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন ২০০৩ সালের ৫ নভেম্বর। এর আগে তিনি ইউটাহর লেফটেন্যান্ট গভর্নর ছিলেন। মূলত গতিশীল নেতৃত্বের অধিকারী দূরদর্শী রাজনীতিবিদ ওলেন ওয়াকার ইউটাহর প্রথম নারী গভর্নর ও নারী লেফটেন্যান্ট গভর্নর।

    ক্যাথলিন বেবিনিয়াস্ক ব্লানকো ২০০৪ সালের জানুয়ারিতে লুুইজিয়ানার ৫৪তম গভর্নর হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। লুইজিয়ানা থেকে গভর্নর হিসেবে একমাত্র মহিলা হিসেবে নির্বাচিত ব্লানকো ২০০৮ সালে দপ্তর ত্যাগ করেন।

    রিপাবলিকান দলীয় সারাহ লুইজ পলিন আলাস্কার নবম গভর্নর হিসেবে ২০০৬ সালে নির্বাচিত হন। রিপাবলিকান দলীয় প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর রানিংমেট হিসেবে নির্বাচন করার লক্ষ্যে ২০০৯ সালে পলিন গভর্নরের পদে ইস্তফা দেন।

    ডেমোক্র্যাটিক দলের আশীর্বাদপুষ্ট বেভারলি ইভাস পারডু ২০০৯ সালে নর্থ ক্যারোলিনার ৭৩তম গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত হন। নর্থ ক্যারোলিনা থেকে মহিলা হিসেবে সর্বপ্রথম নির্বাচিত গভর্নর পারডু অসামান্য দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন শেষে ২০১৩ সালে দপ্তর ত্যাগ করেন।

    রিপাবলিকান ক্রিস্টি লিন নোয়েম ২০১৯ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে অদ্যাবধি সাউথ ড্যাকোটার গভর্নরের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
    ডাকসাইটে ডেমোক্র্যাট গিনা ম্যারি রেইমন্ডো বিশেষ পারদর্শিতার সাথে রোড আইল্যান্ডের ৭৫তম এবং একমাত্র মহিলা গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২০২১ সাল থেকে অদ্যাবধি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ৪০তম বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
    ২০০১ সালের ২ জানুয়ারি থেকে ২০০৫ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত পোর্টো রিকোর মহিলা গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন করিতকর্মা রাজনীতিবিদ সিলা ম্যারিয়া ক্যালডারন। সাল পর্যন্ত বিশেষ দক্ষতার সাথে পোর্টো রিকোর গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন বরেণ্য মহিলা রাজনীতিবিদ ওয়ান্ডা এমিলিয়া ভ্যাজকুয়েজ গারকেড। এর আগে ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি ঊনবিংশ সেক্রেটারি অব জাস্টিসের দায়িত্বও পালন করেন।

    গুয়ামের ২৯তম গভর্নর হিসেবে ২০১৯ সাল থেকে বিশেষ নৈপুণ্যের সাথে দায়িত্ব নির্বাহ করে আসছেন অন্যতম জাঁদরেল মহিলা রাজনীতিবিদ লুরডেস আফলাগু লু লিয়ন। গভর্নর নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি উপর্যুপরি পাঁচবার গুয়ামের সিনেটর নির্বাচিত হন।
    সংগত কারণে উল্লেখ করতে হয়, পুরো আমেরিকার মধ্যে আলাবামা, অ্যারিজোনা, কানেকটিকাট এবং নিউ মেক্সিকো রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দল থেকেই মহিলা গভর্নর নির্বাচিত করেছিল। আর অ্যারিজোনা থেকে মহিলারা চারবার গভর্নর নির্বাচিত হয়েছিলেন। উপসংহারে বলা যায়, দূরদর্শী রাজনীতিবিদ কমলা হ্যারিস যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে বর্তমানে দায়িত্বরত রয়েছেন। রাজনৈতিক পরিবর্তনের এই ধারা অব্যাহত থাকলে নিকট ভবিষ্যতে হয়তো-বা মহিলারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবেও নির্বাচিত হয়ে নতুন ইতিহাসের জন্ম দেবেন।

    সহযোগী সম্পাদক, ঠিকানা, নিউইয়র্ক
    ৩১ আগস্ট ২০২১