বিচারক নির্বাচিত হলে সততার সঙ্গে ন্যায়বিচার করব

    নাশরাত আর্শিয়ানা চৌধুরী : আগামী ২ নভেম্বর নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের চূড়ান্ত নির্বাচন। ওই দিন মেয়র, সিটি কাউন্সিলম্যান পদের পাশাপাশি কম্পট্রোলার, পাবলিক অ্যাডভোকেট, বরো প্রেসিডেন্ট, সিভিল কোর্টের বিচারকসহ বিভিন্ন পদে ভোট হবে। গত ২২ জুনের প্রাইমারি নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক ও রিপাবলিকান দল থেকে প্রতিটি পদে বিজয়ী দুই প্রার্থী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এই চূড়ান্ত নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। কুইন্স কাউন্টির সিভিল কোর্টের বিচারক পদে ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অ্যাটর্নি সোমা সায়ীদ। প্রাইমারি নির্বাচনে ৯৩ হাজার ভোটে জয়ী সোমা চূড়ান্ত নির্বাচনে দ্বিগুণ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হওয়ার প্রত্যাশা করছেন। এ লক্ষ্যে চালিয়ে যাচ্ছেন বিরামহীন প্রচারণা। সভা-সমাবেশ, লিফলেট বিতরণ আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ও তার ক্যাম্পেইন চালাচ্ছে ব্যাপক প্রচার। সোমা সায়ীদ নিজ দল ও কমিউনিটিতে ব্যাপক গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয়। পাশাপাশি অন্যান্য কমিউনিটি এবং ধর্ম-বর্ণের মানুষের সঙ্গে রয়েছে তার সুসম্পর্ক। তাই বাংলাদেশিসহ এশিয়ান এবং অন্যান্য জাতিসত্তার মানুষের ভোটও পাবেন বলে দৃঢ় আশাবাদী। ইতিমধ্যে আর্লি ভোট শুরু হয়ে গেছে। চলবে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। তিনি ভোটারদের আর্লি ভোট দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। সোমা সায়ীদ বিজয়ী হলে তিনি হবেন নিউইয়র্ক সিটির বিচার বিভাগে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রথম বিচারক।

    গত ২৪ অক্টোবর দুপুরে ঠিকানা অফিসে এক সাক্ষাৎকার দেন অ্যাটর্নি সোমা সায়ীদ। নির্বাচনী প্রচারণা, নির্বাচিত হতে পারলে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং নিজ নির্বাচনী এলাকা ও কমিউনিটির কল্যাণে তার ভূমিকা কেমন হবে ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি খোলামেলা আলোচনা করেন। তার সঙ্গে সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশটুকু পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

    শুরুতেই নির্বাচনী প্রচারণা সম্পর্কে সোমা সায়ীদ বলেন, নির্বাচনী প্রচারণা বেশ ভালোভাবে চালাচ্ছি। পাশাপাশি বিভিন্ন কমিউনিটির সাথে বৈঠক করছি। ভোটব্যাংক রয়েছে, এমন ক্লাব-সংগঠনের সাথেও কথা বলছি। কুইন্স এবং কুইন্সের বাইরের মানুষও নির্বাচনী কাজে আমাকে সহায়তা করছেন। এশিয়ান, সাউথ এশিয়ান, বাংলাদেশি কমিউনিটি, হিস্পানিক, হোয়াইট, ব্ল্যাকসহ সব কমিউনিটির কাছ থেকে সহায়তা পাচ্ছি। অনেক অফিশিয়াল আমাকে এনডোর্স করেছেন। সাপোর্ট পাচ্ছি। লিটারেচার ড্রপ করছি। ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামেও প্রচারণা চালাচ্ছি। লিফলেট, ফ্লায়ারও দেওয়া হচ্ছে।

    চূড়ান্ত নির্বাচনে জয়লাভের ব্যাপারে কতটা আশাবাদী, এই প্রশ্নে তিনি বলেন, নির্বাচনে জয়ী হতে হলে ক্লিয়ার ম্যান্ডেট থাকতে হয়। সেই ম্যান্ডেট অনুযায়ী একজন প্রার্থীকে চলতে হয়। আমি সেই চেষ্টা করছি। কমিউনিটির বোর্ড, নেতৃবৃন্দ, ডেমোক্র্যাটিক ক্লাবসহ সব জায়গায় যাচ্ছি। তারা সমর্থন দিচ্ছেন। আমি ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রার্থী হিসেবে জেনারেল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। আমার নির্বাচনী এলাকা কুইন্স ডেমোক্র্যাটিক অধ্যুষিত। জুনের প্রাইমারি নির্বাচনে আমি ৯৩ হাজার ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছি। চূড়ান্ত নির্বাচনে দুই লাখ ভোট পাব বলে আমার বিশ্বাস। জুনের প্রাইমারি নির্বাচনের পর জুলাই মাসটা গেল রিকাউন্টিংয়ে। আগস্টে বেশির ভাগ মানুষ ভেকেশনে ছিলেন। এ ছাড়া অনেকেই তাদের ছুটি ও পরিবার নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। মূলত লেবার ডে উইকেন্ড থেকেই শুরু হয়েছে নির্বাচনী প্রচারণা। ২ নভেম্বরের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী।
    প্রতিদ্বন্দ্বীর বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি সোমা বলেন, আমার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান দলের প্রার্থী উইলিয়াম শাহনান। প্রাইমারি নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। কুইন্স ডেমোক্র্যাটদের এলাকা হওয়ায় রিপাবলিকান ভোট অনেক কম। তবু প্রতিদ্বন্দ্বী যতই দুর্বল হোন না কেন, তাকে হিসাবে রাখতে হয়। তাই আমি সতর্কতার সঙ্গেই এগোচ্ছি এবং জয়ী হওয়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।

    এদিকে ২৩ অক্টোবর থেকে আর্লি ভোট শুরু হয়েছে। এই ভোট শেষ হবে ৩১ অক্টোবর। এ বিষয়ে তিনি বলেন, আর্লি ভোটিংয়ের প্রথম দিনে ২৩ অক্টোবরই আমি ভোট দিয়েছি। ভোটকেন্দ্রে তেমন বড় লাইন নেই। সেখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেই ভোট হচ্ছে। মানুষ দাঁড়ানোর পর্যাপ্ত স্পেসও রয়েছে। তাই আমার কমিউনিটিসহ কাউন্টি ও বরোর সবাইকে অনুরোধ করছি, আপনারা আগেভাগে ভোট দিন। নিজে ভোট দিন এবং পরিবারের অন্য ভোটারদেরও ভোটদানে উৎসাহিত করুন। সন্তানদেরও ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যান। আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন আমার বাবা বিভিন্ন সরকারি অফিসে বিভিন্ন কাজে এবং ভোটকেন্দ্রে আমাকে নিয়ে যেতেন। সবকিছু না বুঝলেও দেখে দেখে মনে রাখতাম। তখন থেকেই আমার মধ্যে একটি স্বপ্ন তৈরি হয়। তাই বলব, আপনারা বাচ্চাদের ভোট দিতে নিয়ে যাবেন। তারা দেখবে, শুনবে, জানবে। এটি তার নাগরিক অধিকার। কারণ আমাদের নতুন প্রজন্মকে মূলধারায় আরো বেশি বেশি করে সম্পৃক্ত করতে হবে। তাই নতুন প্রজন্মকে নেতৃত্বে নিয়ে আসতে হবে। ছোটবেলা থেকেই সেভাবে গড়ে তুলতে হবে।

    নির্বাচিত হলে বিচারক হিসেবে কী কী কাজ করার সুযোগ আছে, জানতে চাইলে সোমা সায়ীদ বলেন, নির্বাচিত হতে পারলে বিভিন্ন ধরনের মামলা আমার কাছে আসবে। কেস নেওয়া, পর্যালোচনা করা, মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে কনজ্যুমার-ট্রানজেকশন, ল্যান্ড ওনার, টেনেন্ট ডিসপুটসহ বিভিন্ন মামলা রয়েছে। সর্বোচ্চ ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত অর্থসীমার মামলা সিভিল কোর্টের জজের এখানে নিষ্পত্তি হয়। আমি মনে করি, প্রতিটি কেস সমানভাবে দেখতে হবে। মানুষের জন্য সুবিচার ও ন্যায়বিচার করতে হবে। জয়ী হলে বাংলাদেশি কমিউনিটির মানুষকে আলাদা করে দেখতে চাই না বরং তাদেরকে মনে করব তারা এ দেশের মূলধারার মতোই একটি কমিউনিটি। সেভাবে গুরুত্ব দিয়ে তাদের জন্য কাজ করব। তারা আমার কাছে কোনো সমস্যা বা কেস নিয়ে এলে যাতে ন্যায়বিচার পান, সেই ব্যবস্থা করব। পাশাপাশি বাংলায় কথা বলতে পারেন এমন বিচারক পেলে তারা কমফোর্ট ফিল করবেন।

    সোমা সায়ীদ এবার বিচারক পদে নির্বাচিত হলে ভবিষ্যতে তার জন্য আরো উচ্চ পদে আসীন হওয়ার সুযোগ আসবে। তিনি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, আপিল কোর্টের বিচারপতিসহ ফেডারেল কোর্টের বিচারপতি হওয়ারও সুযোগ পেতে পারেন। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, আমার এসব ক্ষেত্রে যাওয়ার সুযোগ আসবে। সেখানেও নির্বাচন হয়। তবে আমি মনে করি, এখন যে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে, সেটি আগে যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে শেষ করা উচিত। এরপর আগামী দিনের চিন্তা করা যাবে। চাইলে এক মেয়াদ শেষে দ্বিতীয় মেয়াদেও বিচারক পদে নির্বাচন করা যাবে।

    নির্বাচিত হওয়ার পর কমিউনিটিকে আগের মতো সময় দিতে পারবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তখন কমিউনিটির রাজনৈতিক এবং ফান্ড রেইজিং কোনো প্রোগ্রামে যাওয়া যাবে না। এ ব্যাপারে বিধিনিষেধ আছে। তবে সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক অনুষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ জজরা চাইলে এডুকেশনসহ বিভিন্ন সেমিনারে যেতে পারেন এবং কথা বলতে পারেন। আমাদের এখানে ক্ষেত্র সীমিত। মোট কথা, আমি নির্বাচিত হলে আমাকে ফেয়ার, নিউট্রায়াল থাকতে হবে। সব কাজে আমাকে না পেলেও আশা করি, এ নিয়ে কেউ ভুল বুঝবেন না। কারণ বিচারক হলে কিছুটা সীমাবদ্ধতা থাকে, সেটি মানতে হবে।

    আপনি আলবেনি ল’ স্কুল থেকে পড়াশোনা করেছেন। আপনার স্কুল কি জানে তাদের একজন শিক্ষার্থী এত বড় পদে অধিষ্ঠিত হতে যাচ্ছেন? এই প্রশ্নে সোমা সায়ীদ বলেন, সত্যি কথা হলো আনুষ্ঠানিকভাবে কলেজকে জানানো হয়নি। তবে আমাদের অ্যালামনাই কমিউনিটি এবং আমার বন্ধুদের মধ্যে যারা ফেসবুকে আছে, তারা সবাই জানে।
    ল’ স্কুলে পড়াকালীন এমন কোনো ঘটনার কথা বলবেন কি, যা আপনাকে জজ হতে অনুপ্রাণিত করেছে? তিনি বলেন, আসলে ল’ স্কুলে তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে ১২ বছর বয়স থেকে আমি ডিসিশন নিয়েছিলাম যে ল’ পড়ব। আমি ছোটবেলায় কথা খুব কম বলতাম। কথা কম বললেও কাজে আমি থেমে থাকিনি। আমি যখন ল’ স্কুলে পড়তাম, তখন আমার বাবা-মা দুজনই অসুস্থ ছিলেন। আমি এমনও চিন্তা করেছিলাম যে এক বছর পড়ায় ড্রপ দিয়ে তাদের দেখাশোনা করব। কিন্তু পরে সেটি করতে হয়নি। তিন বছরের কোর্স ছিল। নির্ধারিত সময়েই তা শেষ করেছি। সেখানে আমি প্রায় ফুল স্কলারশিপ পেয়েছিলাম। তবে থাকতে হতো নিজে বাসা নিয়ে, খরচ ছিল বেশি। পড়ার ফাঁকে আমাকে কাজ করতে হতো। লোন ছিল সামান্যই। সেগুলো এখনো পুরোপুরি শোধ হয়নি। আস্তে আস্তে দিয়ে দিচ্ছি। অনেক কষ্ট করে ল’ স্কুলের পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।
    বাবা-মা আপনার সাফল্য দেখে যেতে পারেননি বলে আফসোস হয় কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আসলে আগে অনেক আফসোস হতো। এখন অনেকটা সয়ে গেছে। বয়সের সাথে সাথে সবকিছুই মানিয়ে নিতে হয়েছে।

    আমাদের কমিউনিটির সন্তানেরা ল’ইয়ার তেমন হতে চায় না, কিন্তু মূলধারার গুরুত্বপূর্ণ পদে যেতে হলে অ্যাটর্নি হওয়া এবং ল’ পড়া জরুরি। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, আমার পরে আমার ভাতিজি ল’ইয়ার হয়েছে। আমার দুই কাজিন ল’ইয়ার হয়েছে। আমি বলব, এখনকার প্রজন্মকে ল’ পড়ার ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলা দরকার। কারণ ল’ স্কুলে পড়তে হলে ডেডিকেশন থাকতে হবে। পড়া শেষ করতে হবে। ফুল স্কলারশিপ না পেলে প্রয়োজনে লোন নিয়ে এবং চাকরি করে পড়তে হবে। মূলধারায় সফল হতে হলে, বিশেষ করে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সফল হতে হলে অবশ্যই আইন বিষয়ে পড়ালেখা করা উচিত।

    উল্লেখ্য, সোমা সাঈদ ১২ বছর বয়সে বাবা-মায়ের হাত ধরে আমেরিকা অভিবাসী হন। বসবাস শুরু করেন কুইন্সে। অ্যাটর্নি সোমার পৈতৃক নিবাস টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার ইসলামপুর গ্রামে। তার প্রয়াত পিতা আফতাব সাঈদ বাংলাদেশে ম্যাজিস্ট্রেট ও প্রয়াত মাতা ছিলেন স্কুলশিক্ষিকা। তার পিতা ছিলেন সাপ্তাহিক বাংলাদেশ’র প্রথম সম্পাদক। কুইন্সের মানুষের সাথে তার গড়ে ওঠে আত্মিক বন্ধন। নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ কিংবা ছোট-বড় নির্বশেষে সবার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন সোমা সাঈদ। অ্যাটর্নি সোমা সাঈদ কুইন্স কাউন্টি ওমেন’স বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন।