ভয়াল ৯/১১ এর দুই দশক

    আবার আমরা স্মরণ করতে যাচ্ছি ভয়াল সেই ৯/১১ এর স্মৃতি। মানবসভ্যতার ইতিহাসে বিশ্ব যুদ্ধের মধ্যেও মনে হয় এমন বর্বর, এমন ভয়ংকর ঘটনা কখনো ঘটেনি। সেই ঘটনা আজও স্মরণ করে শান্তিকামী, মানবিক ও মনুষ্যত্বসম্পন্ন সভ্য মানুষ ভয়ে শিউরে ওঠে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সংঘটিত বর্বরতা স্মরণ করে হৃদয়ে স্বজন হারানোর ব্যথা অনুভব করে। এখনো আমাদের পাঁজর ভাঙে সেদিনের সেই সভ্যতার বিরুদ্ধে সংঘটিত ঘটনা স্মরণ হলে। আমরা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ি। এমন সন্ত্রাসী হামলা আমেরিকার মতো দেশে কোনো চরমপন্থী সন্ত্রাসী সংগঠন ঘটাতে পারে, আজও তা মানুষের ভাবনায় আসে না।
    ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার। সকাল ৮টা ৩৯ মিনিট থেকে ৮টা ৪৫ মিনিট। আমেরিকার ওপর চারটি সমন্বিত হামলা। নিউইয়র্কের অহংকারের প্রতীক, বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র বা ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে দুটি টুইন টাওয়ার, ওয়াশিংটনে সিআইএ সদর দপ্তরে একটি এবং পেনসিলভানিয়ায় একটি হামলা। আমরা যারা নিউইয়র্কে বাস করি, তারা দেখেছি, কীভাবে পাঁচ মিনিটের মধ্যে দুটি সন্ত্রাসী বিমান হামলায় ১১০ তলার দুটি দীর্ঘ ভবন ধসে গেল। নিউইয়র্কসহ বিশ্ববাসী কীভাবে ভয়ে আর্তনাদ করে উঠল। হাজার হাজার মানুষ ছাইয়ের সঙ্গে মিশে গেল সবার সামনে সেই দৃশ্য আজও জীবন্ত। এ রকম ভয়ংকর দৃশ্য কারো পক্ষে বিস্মৃত হওয়া সম্ভব নয়।
    সেই হামলায় ২ হাজার ৯৯৬ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান, যারা ঘর থেকে প্রিয়জনদের কাছে বিদায় নিয়ে বের হওয়ার সময় ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি তিনি আর প্রিয়জনদের মাঝে ফিরে আসবেন না। এ যাওয়াই তাদের শেষ যাওয়া। আহত হন প্রায় ২৫ হাজার মানুষ, যাদের অনেকে এখনো সেদিনের সেই আক্রমণের ক্ষতচিহ্ন নিয়ে বেঁচে আছেন। নিহতদের মধ্যে ১০ জন বাঙালিও আছেন। তাদের পরিবারের সদস্য, স্ত্রী-পুত্র-কন্যারা আজও বিরহব্যথায় কাতর থাকেন। আজও তাদের গভীর ভালোবাসায় স্মরণ করেন স্বজনেরা। সাধারণ মানুষ, যারা কোনো আপনজনকে হারাননি, তারাও ৯/১১ জাতীয় স্মরণ দিনে সবাইকে গভীর শ্রদ্ধা ও মমতা নিয়ে স্মরণ করেন। এই সন্ত্রাসী হামলার পর কর্তব্য পালন করতে, ভিকটিমদের উদ্ধার করতে ফায়ার ডিপার্টমেন্ট ও পুলিশ সদস্যরাও মৃত্যুকে বরণ করেন। তাদের সবাইকে বীরের মর্যাদায় স্মরণ করা হয় প্রতিবছর ৯/১১ এর স্মরণ দিনে। উল্লেখ্য, প্রতিবছর ৯/১১ ব্যক্তিগত স্মরণ-আয়োজন ছাড়াও আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি পর্যায়েও পালিত হয় স্বজন হারানোর দিনটি। ওইদিন যেখানে যেখানে যে সময়ে হামলা হয়, সেই সময়ে ওইসব জায়গায় বিরাট আয়োজনে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের স্মরণ করা হয়ে থাকে প্রতিবছর নিয়মিত। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটছে না। নিউইয়র্কে বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের পাদদেশে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়ে নিহতদের স্মরণ করবেন। ওই হামলায় নিহত হয় সন্ত্রাসী হামলাকারীদের ১৯ জন, যাদের প্রতি মানুষ আজও ঘৃণা প্রকাশ করে থাকে।
    এই হামলার দায় স্বীকার করে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদা। তার নেতা ছিল ওসামা বিন লাদেন। আর তাকে আশ্রয় দিয়ে আল-কায়েদাকে সন্ত্রাসবাদী, জঙ্গি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয় ইসলামি জঙ্গি দল তালেবানের নেতা মোল্লা ওমর। তারা আফগানিস্তানে ইসলামের নামে জঙ্গি শাসন চালিয়েও ক্ষান্ত দেয়নি। বিশ্বজুড়েই জঙ্গিবাদ বিস্তারের আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। এই হামলার প্রতিশোধ নিতে আমেরিকা প্রথমে আফগানিস্তান এবং পরে ইরাকে হামলা চালিয়ে আফগানিস্তানকে তালেবানি শাসন এবং একনায়ক সাদ্দাম হোসেনের স্বৈর শাসন থেকে ইরাককে মুক্ত করে। পরে মার্কিনিদের হাতে ধরা পড়ে সাদ্দাম হোসেনের বিচারের মাধ্যমে ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড হলেও ওসামা বিন লাদেন ও মোল্লা ওমর মার্কিন হামলায় নিহত হয়। মোল্লা ওমর আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর এক বিমান হামলায় ২০১৩ সালের ২৩ এপ্রিল নিহত হয়। লাদেন নিহত হয় আমেরিকার নেভি সিলের অতর্কিত হামলায় ২০১১ সালের ২ মে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে।
    আমেরিকার ওপর আল-কায়েদার হামলা এবং আফগানিস্তান ও ইরাকে আমেরিকার প্রতিশোধমূলক হামলায় বিশ্বে রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বিরাট প্রভাব ফেলে। কূটনীতিরও বাঁক বদল হয়। আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্কে নতুন করে মেরুকরণ লক্ষ করা যায়। আমেরিকার মতো দুর্দান্ত প্রতাপশালী দেশ, বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তির বিরুদ্ধে আল-কায়েদার এত বড় হামলার সাফল্যে বিশ্ব সন্ত্রাসবাদীরা উৎসাহিত বোধ করে। অন্যদিকে আমেরিকার নেতৃত্বে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহও নিজেদের মধ্যে নতুন করে মৈত্রী ও সংহতি দৃঢ় করতে একে অপরের মধ্যে নৈকট্য প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব অনুভব করে। সেভাবেই তারা আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়। এই হামলাকে ঘিরে আমেরিকা ও ইউরোপের মধ্যে নতুনভাবে আরও ঘনিষ্ঠ ঐক্য গড়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ৯/১১ এর প্রভাব এখনো লক্ষ করা যায়।
    এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও বড় এবং বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে গেছে, যাকে অনেকেই ইতিহাসের করুণ পরিহাস বলে উল্লেখ করছে। ২০ বছর আগে ২০০১ সালে যে তালেবানকে ধ্বংস করে মানবসভ্যতাকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি বাসযোগ্য বিশ্ব গড়ে তুলতে এত ধ্বংসযজ্ঞ, এত প্রাণহানি, এত ক্ষয়ক্ষতি, ২০ বছর পর হঠাৎই যেন মনে হচ্ছে সেই তালেবানের কাছেই আবার ক্ষমতা দিয়ে আমেরিকার পিছু হটে আসা মানে অসহায় আত্মসমর্পণ। গত শতকের ষাটের দশকে ভিয়েতনামে ঠিক ২০ বছর- ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৫-টন টন নাপাম বোমা ফেলে বেশুমার মানুষকে মেরে, ফসলের ক্ষেত বিরান করে, শিল্পকারখানা ধ্বংস করে কমিউনিস্টদের কাছে নাস্তানাবুদ হয়ে রণে ভঙ্গ দিয়ে ফিরে আসার ঘটনা এখনো ওই প্রজন্মের মানুষের স্মৃতিতে সমুজ্জ্বল।
    এই যে ২০ বছরে আমেরিকার দম এবং উৎসাহ ফুরিয়ে যাওয়া কিংবা ২০ বছর পর নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে পিছু হটা আমেরিকার কাছে কতটা প্রত্যাশা করে তার মিত্ররা, সেটা গভীরভাবে ভেবে দেখার দাবি রাখে। ভিয়েতনামে যুদ্ধ শেষ করা আর আফগানিস্তানে তালেবানদের তাড়িয়ে আবার তাদেরই বিজয় প্রত্যক্ষ করা অবশ্য মোটেও এক পাল্লায় মাপা যাবে না। ভিয়েতনামের যুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। ভিয়েতনামি জনগণের মঙ্গলের জন্য, তাদের শান্তি ও ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুন্দর ও আলোকিত করার লক্ষ্যে সেই যুদ্ধ করেছে ভিয়েতকংরা। আমেরিকা সেখানে গিয়েছিল প্রক্সি যুদ্ধ করতে। দক্ষিণ ভিয়েতনামের পক্ষে অর্থাৎ পুঁজিবাদের পক্ষে লড়তে। দুটি মতবাদেরÑপুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের লড়াই। সেখানে সমাজতন্ত্রের পক্ষে লড়াইয়ে আমেরিকা বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষের সমর্থন ও সহযোগিতা লাভ করেছে। সেখানে আমেরিকার সরে আসাকে তাই শুভবুদ্ধি বলে প্রশংসা করা হয়।
    কিন্তু আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার সরে আসাকে তার মিত্ররা পর্যন্ত অনেকে কুবুদ্ধির উদয় বলে সমালোচনা করছে। কেননা তালেবানরা হচ্ছে সভ্যতার শত্রু। মানবতা ও মনুষ্যত্বের অপশক্তি। তালেবানরা আলোর শত্রু। অন্ধকারের অপশক্তি। সেই অপশক্তির হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়ে দেশের সকল নারী-পুরুষকে জিম্মি হতে দিয়ে পিছুটান দেওয়াকে তাই অনেকেই সমর্থন করতে পারছে না। এতে শুভশক্তির পক্ষে যারা, তারা হতাশ। আমেরিকার ওপর থেকে তারা ভরসা ও আস্থা হারাচ্ছে। বিশেষ করে, আফগানিস্তানে যারা আমেরিকার হয়ে কাজ করেছে, তালেবানের পরাজয়ে যেসব নারী-পুরুষ কাজ করেছে এবং তালেবানের পরাজয়ে যে নারীরা মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে, সুশিক্ষায় আলোকিত হওয়ার স্বপ্ন দেখে যারা নির্ভয়ে তালেবানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে দাঁড়িয়েছে, তারা ইতিমধ্যেই তালেবানের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতে তাই আমেরিকা যত সৎ উদ্দেশ্য নিয়েই কোনো দেশ দখল করুক, তারা সেই দেশের ভেতরে কোনো মিত্র খুঁজে পাবে কি না, সংশয় থেকে যায়।
    তার পরও মানুষ আমেরিকার ওপর ভরসা না করলেও নিজেদের ওপর আস্থা রাখে যে, অপশক্তি যতই প্রবল হোক, শুভ ও কল্যাণ শক্তির কাছে পরাজিত হবেই। অন্ধকার হারবেই আলোর কাছে। সভ্যতার কাছে অসভ্যতার পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। ভালোবাসার উঠোনে ঘৃণার কোনো জায়গা হতে পারে না।
    আজ হোক, কাল হোক, আমেরিকা যতই সরে আসুকÑআফগানিস্তানের মানুষ একদিন নিজেদের শক্তিতেই স্বদেশকে তালেবানমুক্ত করে স্বাধীনতার ফসল ফলাবে। স্বাধীনতার পতাকা ওড়াবে। স্বাধীনতাকামী আফগানিরা আমেরিকার পতাকা আর তালেবানদের পতাকার মধ্যে খুব একটা পার্থক্য দেখে না। ভবিষ্যৎ যেমনটাই হোক, বর্তমানটা খুবই সতর্ক হওয়ার সময়। তালেবানরা যে নতুনভাবে শক্তি সঞ্চয় করে পুনরায় আক্রমণ করবে না, তা কেউ বলতে পারে না। সাপ কখনো বিশ্বস্ত হয় না, পোষ মানে না। সুযোগ পেলেই দংশন করে।
    আমরা বিশ্ব থেকে সকল অপশক্তি, জঙ্গি ও সন্ত্রাসী শক্তি এবং প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির ধ্বংস কামনা করি। ৯/১১ এ নিহত সকলকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি। আহতদের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা।