শিক্ষক, অভিনেতা ও নাট্যকার ইনামুল হক স্মরণে

    স্মরণ

    মোহাম্মদ জামান খোকন :

    গত ১১ অক্টোবর প্রখ্যাত শিক্ষক, অভিনেতা ও নাট্যকার ড. ইনামুল হক পরলোকগমন করেছেন (ইন্নালিল্লাহে… রাজিউন)। দুপুরের খাবার খাওয়ার পর চেয়ারে বিশ্রামরত অবস্থায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।
    সদ্যপ্রয়াত ইনামুল হকের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২৯ মে, ফেণী সদর উপজেলার মোটবী ইউনিয়নে। বাবা ওবায়দুল হক। মা রাজিয়া খাতুন। ছোটকালে মা মারা যাওয়ার পর ফুফুর কাছে বড় হন।

    শিক্ষা জীবন : ফেণী পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক এবং ঢাকা নটর ডেম কলেজ থেকে আইএসসি পাশ করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন শাস্ত্রে এমএসসি পাশ করেন।

    কর্মজীবন : ১৯৬৫ সালে তিনি বুয়েটে রসায়ন বিভাগের শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি একাধারে ১৫ বছর বুয়েটের রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালণ করেন। ২ বছর ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিনের দায়িত্ব পালণ করেন। দীর্ঘ ৪৩ বছর শিক্ষকতার পরে অবসরজীবন গ্রহণ করেন। বুয়েটের ছাত্ররা তাকে নাম দিয়েছিলো ‘কসির উদ্দিন’। বাংলাদেশ টেলিভিশনে তখন একটি ধারাবাহিক নাটক প্রচারিত হয়েছিলো। সেটি খুবই জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো, সেই নাটকে ‘কসির উদ্দিন’ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি অনেক সুনাম কুড়িয়েছেন।

    সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ততা : নটর ডেম কলেজে পড়াশুনার সময় শিক্ষক ফাদার গাজালীর নির্দেশনায় ‘ভাড়াটে চাই’ নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমেই হাতেখড়ি। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’ সংগঠনের তিনি অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তার সেই ভার্সিটির ব্যাচেলর বাসাতেই এ সংগঠন জন্মলাভ করে। সাথে ছিলেন দীর্ঘ ৫০ বছরের বন্ধু আবুল হায়াত। তিনি এই সংগঠনের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালণ করেন। এ সংগঠনের হয়ে তিনি প্রথম মঞ্চে অভিনয় করেন ‘বুড়ো শালিকের ঘাঁড়ে রোঁ’ নাটকে। নাটকটির নির্দেশনায় ছিলেন আতাউর রহমান। এরপর এ দলের অন্যান্য নাটক, যেমনÑ ‘দেওয়ান গাজীর কিস্সা’, ‘নূরল দীনের সারাজীবন’সহ বহু নাটকে অভিনয় করেন। পরবর্তীতে তিনি ‘নাগরিক নাট্যাঙ্গন’। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দলটির সভাপতির দায়িত্ব পালণ করেন। ১৯৮৩ সালে লেখা টেলিভিশন নাটক ‘গৃহবাসী’কে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের জন্য প্রথম মঞ্চ নাটকে রূপান্তর করেন। তারপর নাগরিক নাট্যাঙ্গনের জন্য তিনি ‘জনতার রঙ্গশালা’, ‘খোলাস’ ও ‘জোয়ার’ নাটকের নির্দেশনা দেন। এ তিনটি নাটকে তিনি অভিনয়ও করেন।

    নিজস্ব লেখা নাটক : প্রথম লেখা নাটক ‘অনেকদিনের একদিন’। ১৯৬৮ সালে আবদুল্লাহ আল মামুন সেটি টেলিভিশনে রূপ দিয়েছিলেন। উদীচীর জন্যও তিনি নাটক লেখেন। নাম ছিলো ‘বিবাহ উৎসব’। টেলিভিশনের জন্য ৬০টিরও বেশি নাটক লিখেছেন। অনেক নাটক অনুবাদ করেছেন। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছিলো স্বাধীনাতর উদ্দীপনা নিয়ে লেখা নাটক ‘আবার আসিব ফিরে’। ১৯৭২ সালের ঐতিহাসিক ১০ জানুয়ারি, যেদিন জাতিয় জনক বঙ্গবন্ধু শেখ শুজিব স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন, সেদিনও তার লেখা নাটক ‘বাংলা আমার বাংলা’ প্রচারিত হয়েছিলো। ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তার লেখা নাটক প্রচারিত হয়েছিল ‘মারা একশত মালঞ্চের’।

    পারিবারিক জীবন : ১৯৭০ সালের ১৪ ডিসেম্বর লাকি ইনামের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। লাকি ইনাম বর্তমানে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালণ করছেন। তিনি কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজে পড়াশুনা করেছেন। তাদের দুই মেয়েÑ হৃদী হক, প্রীতি হক। দুই জামাতা লিটু আনাম ও সাজু খাদেম। তারা সবাই নাটকের সঙ্গে জড়িত।

    ড. ইনামুল হকের অনেকে নাটকই দেখেছি। আমার কাছে নোয়াখালীর ভাষায় নির্মিত ‘গাঁও গেরামের কিস্সা’ নাটকটি বেশি পছন্দের। ঐ নাটকে তিনি টনি ডায়েসের বাবার ভূমিকায় অভিনয় কনে। এক পর্যায়ে দেখা যায়, টনি ডায়েস সৌদি আরব থেকে ফিরে আসে। তার জন্য মেয়ে দেখতে গিয়ে বাবা নিজেই বিয়ে করে নিয়ে আসেন। রাতের বেলায় হ্যাজাক লাইট ব্যান্ড পার্টি নিয়ে বাড়ি ফিরেন। টনি ডায়েস ঘরের দরজা খুলে দেখেন বাপ নতুন বউসহ উঠানে! ডায়েস বলেন, ‘আমনের বয়সত ৭০ এর কম ন কন?’ উত্তরে ইমামুল হক বলেন, ‘কিয়া কও আর বয়স ৭৫’। কি ভাবের সাথে উত্তর! এরকম অনেক অভিনয় করেই তিনি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন।

    জীবন দর্শন : তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, অজানাকে জানার প্রবল ইচ্ছাশক্তি ছিলো আমার। তাছাড়া আমি প্রতিষ্ঠিত মানুষের কর্মযজ্ঞ সম্পর্কে গভীরভাবে জানার চেষ্টা করতাম’। সত্যি তিনি নিরলসভাবে চেষ্টা করেছেন, যেমনিভাবে শিক্ষকতার সময় ছাত্রদের প্রিয় শিক্ষক ছিলেন। ঠিক তেমনি নিজের সাংস্কৃতিক কর্মীদের কাছে এবং অগণিত দর্শকের কাছেও জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি তরুণদেরকেও তার যাপিতজীবন থেকে শিক্ষা নিতে বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি কাজের মাধ্যমেই এগিয়ে গিয়েছি। আমি অকর্মা মানুষ নই। অকর্মা মানুষ থাকতে চাই না। সবসময় কিছু না কিছু করে গেছি। সে যেমন দেশ বা সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য, তেমনি আমার পরিবারের জন্য।’

    শিক্ষকতা ও নাটকের সঙ্গে কোন বৈরিতা আছে কিনা? এ প্রশ্নের জবাবে সবসময় বলতেন, ‘দুটোর মধ্যে কোন বৈরিতা নেই। কারণ, সেখানেও একটা শিক্ষা! নাটকেও একটা শিক্ষা’। এ শিক্ষাই তিনি জীবনব্যাপী চালিয়ে গিয়েছেন।
    অর্জন : শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক লাভ করেন।

    তার জীবন দর্শন থেকে আমাদের জন্য শিক্ষা : তিনি একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন, লেখাপড়ার তিনি তা প্রমাণ করেছেন। শিক্ষক হিসাবে ছাত্রদেরকে নিষ্ঠাবান ও সৎকর্মের অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। নিজের লেখা নাটক ও অভিনয়ের মাধ্যমে সমাজ থেকে কুসংস্কার ও অন্যায়কে প্রতিরোধের শিক্ষা জনগণকে দিয়ে গেছেন। আরো একটা শিক্ষা আমরা পেয়েছি, সেটা হলোÑ জীবনে ভালো কাজ করতে হবে। মৃত্যুর জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকতে হবে। মহান আল্লাহ সোবহান তায়ালা ও রাসুল (সা.)-এর পথে চলতে হবে। জানি না কোন সময় যমদূত এসে আমাদেরকে এই সুন্দর পৃথিবী থেকে নিয়ে যাবে। আসুন আমরা প্রাণভরে গুণী লোকটির জন্য দোয়া করি, সৃষ্টিকর্তা যেনো তাকে পরপারে শান্তিতে রাখেন। পরিশেষে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনাÑ হে মহান সৃষ্টিকর্তা, তুমি যে বিপদ আমাদেরকে দিয়েছো, তা থেকে আমাদেরকে রক্ষা করো। আমরা যেনো তোমার ও রাসুলের পথে জীবনযাপন করতে পারি, সেই শক্তি দাও। আমীন।

    লেখক : কলামিস্ট, নিউইয়র্ক।