হাঙ্গার স্ট্রাইক সফল হওয়ায় ৬ হাজার ক্যাবি উপকৃত হবেন

    নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলি মেম্বার জোহরান মামদানি

    নাশরাত আর্শিয়ানা চৌধুরী : নিউইয়র্কে বাংলাদেশিদের অত্যন্ত প্রিয়মুখ ও পরম বন্ধু নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলি মেম্বার জোহরান কে মামদানি। এস্টোরিয়া ও লং আইল্যান্ড সিটি এলাকা নিয়ে গঠিত ডিস্ট্রিক্ট-৩৬-এর নির্বাচিত অ্যাসেম্বলি মেম্বার তিনি। এই ডিস্ট্রিক্টে অনেক বাংলাদেশির বসবাস। বাংলাদেশিরা যেকোনো সমস্যায় জোহরান মামদানির শরণাপন্ন হলে তিনি তাদের পাশে দাঁড়ান। ঋণের ভারে জর্জরিত বাংলাদেশি মেডালিয়ন ট্যাক্সি ড্রাইভার ও মালিকেরা ঋণ মওকুফের দাবিতে সম্প্রতি হাঙ্গার স্ট্রাইকে যেতে বাধ্য হন। মামদানি তাদের দাবির প্রতি একাত্মতা পোষণ করে এই আন্দোলনে সরাসরি সমর্থন দেন। শুধু তা-ই নয়, এই হাঙ্গার স্ট্রাইকে তিনি ট্যাক্সি ড্রাইভার ও মালিকদের সঙ্গে নিজেও রাস্তায় দাঁড়ান। তাদের ঋণমুক্ত করতে মেডালিয়ন কোম্পানির সঙ্গে কথা বলেন। তার প্রচেষ্টায় সহজ শর্তে লোন পরিশোধ করার সুযোগ পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন ট্যাক্সি ড্রাইভার ও মালিকেরা। এটা মামদানির অনেক বড় সাফল্য। এর বাইরেও তিনি বাংলাদেশিদের বাড়িভাড়া সমস্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতার হাত বাড়ান।
    জোহরান মামদানির বাবা মাহমুদ মামদানি উগান্ডান আমেরিকান আর মা মীরা নাইয়ার ভারতীয় আমেরিকান। মাহমুদ একজন সায়েন্টিস্ট আর মীরা প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক। সাত বছর বয়সে জোহরান মামদানি উগান্ডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। এখানে এসে তিনি স্কুলে ভর্তি হন। তিনি হাইস্কুল পাস করেন ব্রঙ্কস সায়েন্স হাইস্কুল থেকে। সেখান থেকে ভর্তি হন বোডইন কলেজে। সেখান থেকে আফ্রিকান স্টাডিজের ওপর ব্যাচেলর সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি হাউজিং ডিপার্টমেন্টে হাউজিং কাউন্সিলর পদে চাকরি করেন। হাউজিংয়ে তিনি ফ্লোর ক্লোজার বিষয়ে কাজ করতেন। এরপর তিনি সেখান থেকে নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলি মেম্বার পদে নির্বাচন করে জয়লাভ করেন। ২৯ বছর বয়সী জোহরান একজন হিপহপ আর্টিস্ট। ব্যক্তিগত জীবনে অবিবাহিত। বাস করেন কুইন্সে। তিনি প্রথম সাউথ এশিয়ান ইমিগ্র্যান্ট, যিনি এই পদে নির্বাচিত হয়েছেন।

    সম্প্রতি ঠিকানার সাথে একান্ত এক সাক্ষাৎকারে জোহরান মামদানি বাংলাদেশিদের সঙ্গে তার হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের কথা, নিউইয়র্ক সিটির বর্তমান অবস্থা, তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও স্বপ্নের কথা অকপটে বলেছেন। তার সঙ্গে সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশটুকু পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো :
    হাঙ্গার স্ট্রাইকের বিষয়ে জানতে চাইলে জোহরান মামদানি বলেন, গত কয়েক দিন আগে মেডালিয়ন ট্যাক্সি ড্রাইভারদের জন্য হাঙ্গার স্ট্রাইক করেছি। আন্দোলন সফল হওয়ার পর এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছি। হাঙ্গার স্ট্রাইক সফল হওয়ায় আমি অত্যন্ত আনন্দিত। মেডালিয়ন ট্যাক্সি ওয়ার্কার ও মালিকেরা ঋণভারে জর্জরিত ছিলেন। তারা ঋণ পরিশোধ করতে পারছিলেন না। রেন্টাল সহায়তা সবাই পাননি। এ অবস্থায় তারা আন্দোলন করছিলেন। আমরা চাইছিলাম তাদের ঋণ মওকুফ করা হোক। সেই ঋণের অনেকখানি মওকুফের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখন একেকজন ড্রাইভার দুই লাখ ডলার লোন দেবেন। এর মধ্যে প্রতি মাসে ১১২২ ডলার করে ২০ বছর ঋণ পরিশোধ করবেন। কোনো কারণে কেউ যদি ঋণ দিতে না পারেন, সিটি এ ব্যাপারে সহায়তা করবে। এ ছাড়া ফেডারেল রিলিফ ফান্ড থেকে সিটি যে অর্থ পেয়েছে, সেখান থেকেও তাদের জন্য অর্থ প্রদান করা হবে। সেটিও ঋণের সাথে সমন্বয় করা হবে। আমি মনে করি, হাঙ্গার স্ট্রাইকারদের সহজ শর্তে ঋণ পরিশোধের বিষয়টি অনেক বড় সাফল্য। তিনি আরো বলেন, আমরা অনেক দিন মেডালিয়ন মালিকদের ঋণ মওকুফের জন্য আন্দোলন করছিলাম। এর মধ্যে ১৫ দিন আমরা হাঙ্গার স্ট্রাইক করেছি। এই আন্দোলনে আমরা অনেকের সমর্থন পেয়েছি। আন্দোলনের সময়টি অল্পদিনের হলেও হাঙ্গার স্ট্রাইক হিসেবে এটি কিন্তু অনেক লম্বা সময়। তার পরও বলব, আমরা শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছি।
    এই আন্দোলনের মাধ্যমে কত সংখ্যক ড্রাইভার লাভবান হয়েছেন-এ বিষয়ে তিনি বলেন, যারা মেডালিয়ন ড্রাইভার বা ওনার ড্রাইভার আছেন, তাদের বেশির ভাগই সাউথ এশিয়ান এবং বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্ট। তারা মিডল ক্লাসের। তাদের ইনকামও অনেক বেশি নয়। তার ওপর ঋণের বোঝা বহন করা কঠিন। এ অবস্থায় মেডালিয়নের বোঝা বহন করা কঠিন ছিল। আমি যখন এই সমস্যা দেখেছি, তখন ঠিক করেছি আমার প্ল্যাটফর্মটি তাদের জন্য ব্যবহারের। সেই হিসেবে তাদের সমর্থন দিয়েছি, কাজ করেছি ও সফল হয়েছি। হাঙ্গার স্ট্রাইক সফল হওয়ায় ৬ হাজার ট্যাক্সি ড্রাইভার উপকৃত হবেন। মেডালিয়নের প্রধান মার্বেলগেট থেকে চার হাজার গাড়ির মালিক ও ড্রাইভার সুবিধা পাবেন। বাকি দুই হাজার অন্যান্য লেন্ডারের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন। তারাও সুবিধা পাবেন।
    বাংলাদেশি আমেরিকানদের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশি কমিউনিটির মানুষেরা আমার হৃদয়ে আছেন। আমার ডিস্ট্রিক্টে অনেক বাংলাদেশি আছেন। নির্বাচনসহ বিভিন্ন কাজে আমি তাদের সহযোগিতা পাই। বাংলাদেশিরা আমার পরম বন্ধু ও সুহৃদ। তাদের জন্য আমি কাজ করছি এবং আরো অনেক কাজ করতে চাই। বাংলাদেশিদের জন্য আমার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে রমজান মাসে খাবারের জন্য বিশেষ সহায়তা করা। আমার ক্যাম্পেইন থেকে একবার ৬৫ হাজার ডলার, আরেকবার ১৫ হাজার ডলার প্রদান করা হয়েছে। ফুড ডিস্ট্রিবিউশনের জন্য আমি সব সময় সহায়তা করে থাকি। আমি বিভিন্ন মসজিদের খাবারের জন্য অর্থ সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করি।
    নিউইয়র্ক সিটির বর্তমান অবস্থার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিউইয়র্র্ক সিটি ভীষণ কঠিন অবস্থার মধ্যে রয়েছে। এখানে অনেকে বিষয়ে পলিসি চেঞ্জ করতে হবে। অনেক জিনিসের দাম বেড়েছে। জিনিসের দাম বাড়ায় মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। মানুষ আয়ের সাথে ব্যয় মিলিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। নিউইয়র্কের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিউইয়র্কে গত সামারে আইনশৃঙ্খলার যে চিত্র ফুটে উঠেছিল, সেই সময়ের তুলনায় বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো। কিন্তু এখানকার ল’ অ্যান্ড অর্ডার সিচুয়েশনের কথা বললে অনেক কথাই বলতে হবে। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেমন রয়েছে; তেমনি রয়েছে গান ভায়োলেন্স, হত্যা, রাহাজানি, ছিনতাই, ডাকাতি, চুরিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ। এ ছাড়া ইনলিগ্যাল ড্রাগসহ বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। সেসব বিষয়ের সমাধান করতে হবে। এ ছাড়া পাবলিক সেফটি, সড়ক দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনার বিষয়ও রয়েছে। করোনা-পরবর্তী অপরাধ-সংক্রান্ত পরিস্থিতিতে যেসব সমস্যা বেড়েছে ও নতুন সমস্যা তৈরি হয়েছে, সেগুলোর সমাধান করতে হবে। আমার এলাকায় একটি পাওয়ার প্ল্যান করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সেটি আমরা বন্ধ করতে পেরেছি। এটি বলব অবশ্যই আমাদের সাফল্য।
    প্রতিনিয়ত সিটির বাসা ভাড়া বৃদ্ধি প্রসঙ্গে জোহরান মামদানি বলেন, বাংলাদেশি কমিউনিটিসহ সিটির মানুষের কমন সমস্যা হচ্ছে বাসা ভাড়া। আগে যেসব বাসার ভাড়া ছিল ৮০০ ডলার, এখন সেসব বাসার ভাড়া ২০০০ ডলার। ১২০০ ডলার বাড়ানো সহজ কথা নয়। প্রায় আড়াই গুণ বেশি। যে পরিমাণে বাসা ভাড়া বেড়েছে, সেই তুলনায় মানুষের আয় বাড়েনি। আর ভাড়াটিয়াদের ব্যাংকে এমন কোনো সেভিংস মানি নেই যে তারা সেই অর্থ দিয়ে বাসা ভাড়া দেবে। মানুষ যা আয় করে দেখা যায় তার বেশির ভাগই চলে যায় বাসা ভাড়ার পেছনে। এই অবস্থা চলতে পারে না। ৮০০ ডলারের বাসা ভাড়া দুই হাজার ডলার হওয়ার পেছনের কারণ হচ্ছে আগে বেশির ভাগ বাড়ির মালিক ছিলেন এখনকার মালিকদের বাবা কিংবা মা। ফলে তারা আগের লিজ আর মানতে নারাজ। তারা বেশি বেশি বাসা ভাড়া বাড়াচ্ছেন। সিটির নিয়ম অনুযায়ী দেড় থেকে সর্বোচ্চ তিন শতাংশ বাসা ভাড়া বাড়ানো সম্ভব। এর বেশি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু সেটা মানা হচ্ছে না। এ অবস্থায় কোনো বাসার ভাড়া যাতে অন্তত আমার ডিস্ট্রিক্টে তিন শতাংশের বেশি বাড়াতে না পারে, সে চেষ্টা আমি করছি। এই সমস্যা সমাধানের জন্য বিল পাস করানোর উদ্যোগ নিচ্ছি।
    নিউইয়র্ক সিটির নবনির্বাচিত মেয়র এরিক অ্যাডামের কাছে তার প্রত্যাশার বিষয় কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি কেবল মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। এখনো দায়িত্ব নেননি। জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি কাজ শুরু করবেন। এরপর দেখতে হবে তিনি কোন কোন কাজগুলো প্রাধান্য দেন এবং কী কী শুরু করেন। আর বর্তমান যে অবস্থা চলছে, সেই অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় বের করতে পারেন কি না? আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, হোমলেসদের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ, মিডল ক্লাসদের জন্য কী ব্যবস্থা নেন, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য আরো বাসস্থানের ব্যবস্থাসহ করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতিতে কী কী করণীয় তা নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন ও পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করতে পারেন কি না তা দেখতে হবে। এখনই মন্তব্য করলে তা অনেক বেশি আর্লি হয়ে যাবে।
    কখনো নিজেকে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র, গভর্নর কিংবা ওয়াশিংটনের কংগ্রেসম্যান কিংবা সিনেট সদস্য হওয়ার মতো স্বপ্ন দেখেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ রকম স্বপ্ন আমি এখনো দেখি না। আমি অত বড় পদে যেতে চাই না। আমি লোকালি থাকতে চাই। বিশেষ করে আমার এলাকাতেই। ওয়াশিংটনে যাওয়ার আমার কোনো পরিকল্পনাই নেই। কারণ সেখানে গেলে আমি অনেক বাংলাদেশি খাবার মিস করব। আমি চাই আমার প্রিয় খাবার খেতে। যেমন বাংলাদেশের প্রিয় খাবার কালা ভুনা ও ভর্তা। সেগুলো ছেড়ে আমি ওয়াশিংটনে থাকতে পারব না। আগামী দিনের স্বপ্ন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার গোল হচ্ছে আগামী দিনে আমার ডিস্ট্রিক্ট থেকে আবারও স্টেট অ্যাসেম্বলিম্যান পদে নির্বাচন করা ও নির্বাচিত হওয়া এবং এলাকার মানুষের জন্য কাজ করা। নির্বাচন কবে হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি হবে ২০২২ সালের জুন মাসে।